-
সংবাদপত্রের পূর্ণস্বাধীনতা পাকিস্তানে কোনো কালে ছিলো না। গত তেরো বছরের সামরিক শাসনের পূর্বে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের কালেও না। কেননা, পাকিস্তান নির্মাতাগণ দেশে ঐক্য আনতে চেয়েছিলেন সত্যকে চাপা রেখে, তবু বাংলা দেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতিক্ষেত্রে স্বল্পকালের মধ্যে যে বিপুল পরিবর্তন সূচিত হয়েছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই পত্রপত্রিকা তাতে একটা সুবৃহৎ ভূমিকা নিয়েছে। বস্তুতপক্ষে, গণমাধ্যম হিশেবে পত্রপত্রিকা সকল দেশেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে, পূর্ব বাংলাতেও করেছে। বরং বলা যেতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিই করেছে। কেননা অধুনালুপ্ত পাকিস্তানের অন্য দুটি গণমাধ্যম বেতার ও টেলিভিশন ছিল পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত, লালিত অথবা উৎসাহিত করেনি, সারাক্ষণ সরকারি প্রচারেই আত্মনিয়োগ করেছে। কিন্তু মানুষ
-
পূর্ব বাংলার তীব্র ভাষা আন্দোলনের মুখে, প্রসন্ন মনে না হলেও, পাকিস্তান সরকার অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিশেবে বাংলার দাবিকে মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৯৫৬ সালে গৃহীত পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দাবি স্বীকৃত হয়। ১৯৬২ সালে তৎকালীন একনায়ক আইয়ুব খাঁর নির্দেশে তথাকথিত জাতীয় পরিষদের কর্তাভজা সদস্যবৃন্দ যে শাসনতন্ত্র রচনা করেন, তাতেও বাংলার দাবি গৃহীত হয়। এই শাসনতন্ত্রে বলা হয়, বাংলা ও উর্দু সকল শিক্ষা ও সরকারি কাজের বাহন হিশেবে ব্যবহৃত হবে। তবে তার পূর্বে এ ভাষাদ্বয়কে ব্যবহারোপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিতে হবে। ১৯৭২ সালে জাতীয় পরিষদ বিবেচনা করেন ইংরেজির পরিবর্তে আলোচ্য ভাষাদ্বয়কে সকল কাজে ব্যবহার করা যায় কি না। ভাষাকে গড়ে
-
পঁচিশে জুলাই মহাবোধি সোসাইটি হলে একটি সেমিনার আয়োজিত হয়েছিলো। বেরিয়ে আসছিলুম। দরজায় এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভারি সুন্দর চেহেরা, বয়স বাইশ-তেইশ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেশ তো বক্তৃতা করলেন: কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকে যত হিন্দু এসেছেন পূর্ব বাংলা ছেড়ে তাঁদের ঠেকালেন না কেন আপনাদের বঙ্গবন্ধু?’ আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলুম, ‘কখনকার কথা বলছেন?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘১৯৪৭ সাল থেকে!’
জানি, এ প্রশ্ন-বিচ্ছিন্নভাবে শুধু এ ভদ্রলোকের নয়: বাংলা দেশ প্রসঙ্গে এ প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকি দেয়। কেউ মুখ ফুটে বলেন, কেউ বলেন না। এ প্রশ্ন মনে জাগাও অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমরা যেহেতু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলুম, তাই প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি কী করে পূর্ব পাকিস্তান পূর্ব
-
১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিলো। প্রস্তাবে বলা হয়েছিলো, কয়েকটি স্বশাসিত প্রদেশ নিয়ে একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করা হবে যে রাষ্ট্রে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পুরোপুরি সংরক্ষিত হবে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এ প্রস্তাবে পাঁচটি শর্ত আছে। ক. ইসলামি সংস্কৃতি-চর্চার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা, খ. হিন্দুদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে মুসলমানদের জন্যে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রগঠন: গ. এই নতুন রাষ্ট্রের জনগণের জন্যে অর্থনৈতিক সুবিচার সুনিশ্চিতকরণ: ঘ. জনগণের রাজনৈতিক অধিকার দান; ও ঙ. সম্পূর্ণ স্বশাসিত প্রদেশ গঠন।
কিন্তু এই শর্তগুলির প্রথম দুটি স্বীকৃত হলেও, অল্পকালের মধ্যে অন্য তিনটি শর্তকে অস্বীকার করার জন্যে একটি সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্র হয়েছে।
এ কথা
-
যদি বলি ১৯৭১ সালে একটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল, তাহলে সম্ভবত কেউই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তবে একাত্তর সালটিকে যারা 'গণ্ডগোলের বছর আখ্যা দেয়, কিংবা যারা বলে যে ওই বছরে ভারতের উস্কানিতে একটা গৃহযুদ্ধ হয়ে তাদের সাধের পাকিস্তানটি ভেঙে গিয়েছিল—এমন কিছু অর্বাচীন মূৰ্খ বা ধুরন্ধর জ্ঞানপাপী বা কুলাঙ্গার দেশদ্রোহী ছাড়া আর সবাই-যে ওই বছরটিকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর বলে গৌরবে উদ্দীপ্ত হবেন—এমন কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবু এরপরও আমি বলব: আমাদের মুক্তিযুদ্ধটি শুধু আমাদেরই যুদ্ধ ছিল না, ছিল বিশ্বযুদ্ধেরই অংশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রচলিত অর্থে যে আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ হয় নি,—একথা অবশ্যই সত্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই যে বিশ্বব্যাপী
-
১৯৫০ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাঁওতাল অধ্যূষিত এলাকা নাচোলে যে রক্তক্ষয়ী কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তাঁর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রামচন্দ্রপুরের জমিদার পুত্রবধূ বিপ্লবের অগ্নিকন্যা ইলা মিত্র (১৯২৫-২০০২)। এলাকায় তিনি পরিচিতা ছিলেন ‘বধূমাতা’ হিসেবে। ১৯৪৫ সালে রামচন্দ্রপুরের জমিদার পুত্র কমিউনিস্ট কর্মী রমেন মিত্রর সঙ্গে বিয়ে হয়। এবং এক সময় তিনি নিজে স্বামীর মত ও পথের সহযাত্রী হন। প্রথম রামচন্দ্রপুরে স্থাপন বালিকা বিদ্যালয়। তারপর আর থেমে নেই। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা প্রতিহত করতে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। সে বছর বাগেরহাটের মৌভোগে যে ঐতিহাসিক বঙ্গীয় কৃষাণ সভার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় চির অবহেলিত কৃষকদের তে-ভাগা আন্দোলনের। সে আন্দোলনের নেতৃত্বদান করেন ইলা মিত্র।
-
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা ভেঙে গেছে। সংবাদটা সমস্ত শহরবাসীর মনের উপর কালো ছায়ার মত নেমে এসেছে। বাতাসটা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে। বেশ বুঝতে পারছি এক মহাবিপর্যয়ের ধারালো খড়্গ ক্ষীণসূত্রে আমাদের মাথার উপর ঝুলছে। যে-কোনো সময় তা ছিঁড়ে পড়ে যেতে পারে। আমরা ক-জন বন্ধু সেই কথা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলাম। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর সময়টা যে এখনই এসে গেছে তা আমরা কেউ ভাবতে পারিনি।
বড়ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন। বড়ভাই ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। ঘরের মধ্যে ঢুকেই তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, এখানে বসে বসে করছ কি তোমরা? এখন কি বসে থাকার সময় আছে! আজ রাত্রেই ওরা হামলা
-
আমরা তাদেরকে খুঁজে খুঁজে খতম করছি।—মেজর বশির, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। রাত আটটা ধানমন্ডিস্থ ৩২নং সড়কের প্রবেশমুখে একটি গলিতে একটি পরিচিত রিকশা দ্রুতগতিতে এসে থামলো। যে ভবনের বাইরে এসে থেমেছে সে ভবনটি হলো শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন। রিকশা চালক কাশছিল এবং হাঁপাচ্ছিল। সে বললো, 'বঙ্গবন্ধুর জন্য একটি জরুরি চিরকুট নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে রিকশা চালিয়ে এসেছি। বাংলায় লেখা স্বাক্ষরবিহীন চিরকুট বার্তাটি ছিল সংক্ষিপ্ত: "আপনার বাসভবন আজ রাতে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে।”
সে সময়ে সেখানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের একজন আমাকে বলেছিলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আসন্ন হামলার খবর ঐ চিরকুটে তাঁরা প্রথমবারের মতো পেয়েছিলেন। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের
-
We're sorting them out...
MAJOR BASHIR, Comilla
At about 8 P.M. on 25 March 1971, an unidentified cycle rickshaw hastily pulled into the lane leading to 32 Dhanmandi and came to a halt outside Sheikh Mujibur Rahman's Dacca residence. The driver was coughing and out of breath. He said he had peddled all the way from the cantonment with an "urgent chit" for Bangla Bandhu. The unsigned message in Bengali was terse: "Your house is going to be raided tonight."
One of those present on the occasion told me it was the first hard news they received of the impending
-
‘...পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ হলেন গণহত্যার নীরব দর্শক...।’
—প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদে, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১
কোনো পাকিস্তানী কোনো বাঙালির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে না, কিংবা কোনো বিদেশি তা' করতে গেলে তাকে অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন এরূপ উক্তি করেছিলেন। কেউ কী এই অপরিহার্য প্রশ্ন উত্থাপন করেছে অথবা আপনারা জানেন কী, এসব কী ঘটেছে? ১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের আগে ঐ ধরনের অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে। শুধু আমারই বলি কেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা পশ্চিম পাকিস্তানী আরো ক'জনেরও হয়েছে। এঁদের মধ্যে বেশ ক'জন উঁচুদরের রাজনীতিবিদ রয়েছেন, যাঁরা ২৫ মার্চের রাতে পূর্ব বাংলায় সামরিক বর্বরতম অত্যাচার সংঘটনের পর বিদেশে গিয়েছেন তাদের সকলকেই
-
লেখক: মোহাম্মদ সেলিম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ভারত
আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতের দিকে তাকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকাকে সহযোগিতামূলক বলার উপায় নেই। বার্মা ও শ্রলঙ্কা ছিল পাকিস্তানের মিত্র। নেপালের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিম-উত্তর পূর্ব দিকে সীমান্তসংলঘ্ন ভারতের পক্ষে কোনো প্রকার ধোয়াটে অবস্থান নেওয়া সম্ভব ছিল না। বলা যায় ভূ-রাজনৈতিক এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ ও সুনির্দিষ্ট।
প্রবাসী সরকার গঠনে সহায়তা
৩ এপ্রিল ১৯৭১ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের আলোচনার আগেই ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় বক্তৃতায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ভারত সরকারের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের
-
লেখক: অজয় দাশগুপ্ত
১৯৭১ সালের পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অধিকৃত বাংলাদেশ ভুখণ্ডে মুক্তিবাহিনী ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। তারা দেশের সর্বত্র গুলি-বোমায় নাস্তানাবুদ করছিল খানসেনাদের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও দিল্লি সফরকালে সেটা ভালোভাবেই অবহিত হতে পেরেছেন। স্বদেশে ফিরে তিনি নিজেও বোমা ফাটালেন, যা কাঁপিয়ে দিল হোয়াইট হাউসকে। রিচার্ড নিক্সন ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের বর্বর গণহত্যা শুরুর পর থেকেই দাবি করে আসছিলেন—পাকিস্তানের সৈন্যরা তাদের দেওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে না। তারা পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু এডওয়ার্ড কেনেডি কংগ্রেসের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাকিস্তানে ২০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অন্নদাশঙ্কর রায় (১)
- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (৩)
- আবদুল গাফফার চৌধুরী (১)
- আসাদ চৌধুরী (১)
- এম এ আজিজ মিয়া (১)
- কামরুদ্দীন আহমদ (১)
- জহির রায়হান (২)
- ধীরাজ কুমার নাথ (১)
- নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১)
- প্রক্রিয়াধীন (১১)
- ফেরদৌসী মজুমদার (১)
- বিকাশ সাহা (১)
- যতীন সরকার (৩)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- শওকত ওসমান (১)
- সত্যেন সেন (২)
- সিদ্দিক সালিক (২)
- সৈয়দ আলী আহসান (১)
- হাসান মুরশিদ (১০)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.