বই
প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ
সত্যেন সেনের প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ বইটি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পূর্ব ইতিহাস, রাজনৈতিক চেতনা ও জনআন্দোলনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে। ব্রিটিশ-পরবর্তী দমননীতি, ভাষা আন্দোলন, ১৯৫২-৭১ পর্বে ছাত্র-জনতার সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম-প্রক্রিয়ার এক সংগ্রামী নথি।
-
ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় বনগাঁ শহরে। তিনিই আমাকে খুঁজে নিয়েছিলেন, না আমিই তাঁকে খুঁজে বের করেছিলাম, সে কথাটা এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে খুব অল্প সময়ের ভেতরেই আমাদের দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একথা ওকথা বলতে বলতে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক বিয়োগবিধুর ও মর্মস্পর্শী কাহিনী বলে চলেছিলেন। ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে ইতিপূর্বে পরিচয় না থাকলেও আমি তাঁর নাম শুনেছি। তাঁর বাড়ি যশোর জিলার ঝিনাইদহ মহকুমায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কোনো এক কলেজে অধ্যাপকের কাজ শুরু করেছিলেন। ভেবেছিলেন, অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার মধ্য দিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। এর চেয়ে আনন্দময় জীবন আর কি হতে পারে! কিন্তু
-
পাক-সৈন্যরা বরিশাল জেলার উপর এসে হামলা করল অনেক পরে, এপ্রিল মাসের শেষের দিকে। বরিশাল জেলার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এই জেলার কোথাও রেলপথের যোগাযোগ নেই। প্রধানত জলপথের সাহায্যেই তাকে অন্যান্য জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। একমাত্র ফরিদপুর জেলার সঙ্গে তার স্থলপথে যোগাযোগ রয়েছে। বরিশাল জেলায় আক্রমণ চালাতে হলে পাক-সৈন্যদের হয় নদীপথে, নয়তো স্থলপথে ফরিদপুর জেলার মধ্য দিয়ে আসতে হবে।
বরিশালের গৌরনদী থানা ফরিদপুরের সীমান্তবর্তী থানা। শত্রুরা যদি বরিশাল শহর দখল করবার জন্য স্থলপথে আসে, তবে তাদের এই থানা-অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে হবে; সুতরাং তাদের প্রতিরোধ করবার প্রথম দায়িত্ব গৌরনদী থানার অধিবাসীদের উপরই এসে পড়বে। শত্রুর হাত থেকে
-
এককালে এই গানটি আমার খুবই পরিচিত ছিল। শ্রমিকদের সভায়, মিছিলে নানা উপলক্ষেই এই গানটি গাওয়া হতো। প্রায় ৩০ বছর আগেকার কথা। ইতিমধ্যে আমার স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে সেই গানের অধিকাংশ পদগুলি খসে ঝরে পড়ে গিয়েছে। মাত্র প্রথম স্তবকটি আজ মনে পড়ছে। কিন্তু তাও সম্পূর্ণ নয়, দুর্ভাগ্যক্রমে তার প্রথম কলিটির কয়েকটি শব্দ হারিয়ে গিয়েছে। আর যেটুকু মনে আছে, তার মধ্যেও ভুল-ভ্রান্তি থাকার সম্ভাবনা আছে।
সত্যি কথা বলতে কি, এতকাল আমার এই প্রিয় গানটির কথা একেবারে ভুলেই ছিলাম। মনে করিয়ে দিল তিতু, আমার এক বিশিষ্ট বন্ধুর ছেলে তিতু। তিতুদের বাড়ি যশোর জেলায়।
গত বছর কি একটা উপলক্ষে তিতুদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তিতুর সঙ্গে সেই
-
২৫-এ মার্চ থেকে শুরু হলো ওদের আক্রমণ। ওদের নিশাচর বাহিনী গভীর রাত্রিতে অতর্কিতে ঢাকা শহরে হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল, সারা শহর রক্তের প্লাবনে প্লাবিত করে দিল। সেই আক্রমণের ঢল দ্রুতবেগে নেমে এলো, দেখতে দেখতে সারা প্রদেশময় ছড়িয়ে পড়ল। এই ধরনের পৈশাচিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। ওদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়াবার মতো প্রস্তুতিও গড়ে ওঠে নি। ওরা ধ্বংসের আগুনে শহরের পর শহর আর গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করতে করতে এগিয়ে চলল। ওদের কামান, মেসিনগান আর আধুনিক যুগের উন্নত ধরনের মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে যা দিয়ে লড়াই করবে, এমন কি হাতিয়ার আছে জনসাধারণের হাতে?
তাহলেও বিদ্রোহী বাঙালি এই
-
মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের চর এসে সংবাদ দিল, সামরিক ভ্যান-বোঝাই একদল পাক-সৈন্য ফেনী থেকে চন্দ্রগঞ্জের দিকে আসছে। ওদের যখন চন্দ্রগঞ্জের দিকে রোখ পড়েছে, তখন ওরা সেখানে লুটপাট না করে ছাড়বে না। খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান। বেঙ্গল রেজিমেন্টের লুৎফর রহমান, যিনি এই অঞ্চলে একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করেছিলেণ। সৈন্যদের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাট জনের মতো হবে। এদের প্রতিরোধ করতে হলে দলে কিছুটা ভারী হয়ে নেওয়া দরকার। খোঁজ-খবর করে অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ছয় জন মুক্তিযোদ্ধাকে জড় করা গেল।
সাতজন মানুষ, সাতটি রাইফেল। এই সামান্য শক্তি নিয়ে ওদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে যাওয়াটা ঠিক হবে কি? মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। কথাটা মিথ্যা
-
চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধের পর সুবেদার লুৎফর রহমান নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিকারের সন্ধানে ছুটে চলেছিলেন। তাঁর এক মুহূর্তও বিশ্রামের অবকাশ নেই। তিনি পাক-সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে দক্ষ শিকারীর মতো তীক্ষè সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ফিরছিলেন। মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচরেরা নিত্য নতুন সংবাদ নিয়ে আসছে। আর সেই সূত্র অনুসরণ করে তাদের মুক্তিবাহিনী যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই শত্রুদের উপর ঘা দিয়ে চলেছে।
আঘাতের পর আঘাত হানো-কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে, কখনও সামনে থেকে, কখনও বা পেছন থেকে। ওদের অস্থির আর পাগল করে তোলো। ওদের কোনো সময় স্বস্তিতে বা শান্তিতে থাকতে দিও না, ওদের প্রতিটি মুহূর্ত দুর্ভাবনায় কাটুক। ওরা যেন ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠে। মুক্তিবাহিনী এই নীতি অনুসরণ
-
গভীর রাত্রিতে ওরা দিনাজপুর শহরে এসে ঢুকল। এ রাত্রি সেই ২৫-এ মার্চের রাত্রি, যে-রাত্রির নৃশংস কাহিনী পাকিস্তানের ইতিহাসকে পৃথিবীর সামনে চির-কলঙ্কিত করে রাখবে।
ওরা সৈয়দপুর থেকে এসে অতি সন্তর্পণে শহরের মধ্যে ঢুকল। শ’খানেক পাঞ্জাবী সৈন্য। শহরের ঢোকার মুখে প্রথমেই থানা। সৈন্যরা প্রথমে থানা দখল করে নিয়ে সেখানে তাদের ঘাঁটি করে বসল। তারপর তারা তাদের পূর্ব-নির্ধারিত পরিকল্পনা-অনুসারে শহরের টেলিগ্রাম ও টেলিফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো। সেইদিনই শেষ রাত্রিতে দিনাজপুরের বিখ্যাত কৃষক নেতা গুরুদাস তালুকদার এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট হিন্দু নাগরিক তাদের হাতে গ্রেফতার হলেন। এমন নিঃশব্দে ও সতর্কতার সঙ্গে এ সমস্ত কাজ করা হয়েছিল যে, শহরের অধিকাংশ লোক তার বিন্দুমাত্র আভাস
-
মুক্তি-আন্দোলনের ঊর্মিমুখর প্রবাহে সারা যশোর জেলা চঞ্চল আর উচ্ছল হয়ে উঠেছে। ছাত্র, যুবক, কৃষক, সাধারণ মেহনতী মানুষ সবাই এগিয়ে এসেছে। ই. পি. আর., পুলিশ, আনসার তারাও পিছিয়ে থাকে নি।
২৩-এ মার্চ তারিখে ই. পি. আর. বাহিনীর জওয়ানরা তাদের ক্যাম্পে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলল, আর সেই পতাকার সামনে শ্রেণীবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ‘গার্ড অব অনার’ দিলো। অবাঙালিরা প্রতিবাদ তুলেছিল, কিন্তু তাদের এ আপত্তি টিকল না। ২৫শে মার্চ তারিখে ঢাকা শহরে ইয়াহিয়ার জঙ্গী-বাহিনীর বর্বর আক্রমণের খবর যখন এসে পৌঁছল, যশোরের মানুষ তাতে ভয় পাওয়া দূরে থাক, বিক্ষোভে ফেটে পড়ল, ক্রোধে গর্জন করে উঠল-এর উপযুক্ত প্রতিশোধ চাই। যশোর ক্যান্টনমেন্টে কামান, মর্টার আর মেসিনগানে সজ্জিত হাজার
-
বাড়ি? বাড়ি আমার বরিশার জেলার মূলাদি গ্রামে। মূলাদির নাম শোনেন নি?
হ্যাঁ, শুনেছি বৈ কি, উত্তর দিলাম আমি।
ছোটো বেলাতে সখ ছিল মিলিটারিতে যাব। শেষ পর্যন্ত সাংসারিক প্রয়োজনে সেই মিলিটারিতেই ঢুকতে হলো। সৈনিকের জীবনটা ভালোই লাগছিল আমার। বছর কয়েক পরে আমাকে স্পেশিয়াল ট্রেনিং-এর জন্য কোয়েটায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আমি প্যারাট্রুপারের ট্রেনিং নিচ্ছিলাম। একটা শত্রু-অধিকৃত অপরিচিত এলাকায় কি করে ধ্বংস কার্য চালাতে হয় এই ট্রেনিং-এর মধ্য দিয়ে তারই শিক্ষা দেওয়া হয়। এ লাইনে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরা বলেন, একজন দক্ষ প্যারাট্রুপার বহু অসাধ্য সাধন করতে পারে। কথাটা যে কত বড় সত্য, আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা বুঝতে পেরেছি। এই ট্রেনিংটা
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.