দৈবেন দেয়ম্
সত্যিকার বাস্তব খবরের চাইতে অমূলক বাজার-গুজবের প্রতিপত্তি যেমন প্রবল, স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষের তুলনায় অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্টের মোহপ্রভাব তেমনি অনেক বেশি। স্পষ্টভাবে যাহাকে দেখি শুনি ও জানি, তাহাকে নাড়িয়া-চাড়িয়া দু'কথায় তাহার নাড়ীনক্ষত্রের হিসাব ফুরাইয়া যায়, কিন্তু যাহাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, সম্ভব-অসম্ভব নানা ডাল-পালায় পল্লবিত হইয়া সে মনের কল্পনাকে ভরাট করিয়া রাখে। তাই প্রত্যক্ষ আলোকের চাইতে অস্পষ্টতার আবছায়াই মনের মধ্যে অধিক সম্ভ্রমের সঞ্চার করে। স্পষ্ট শাসনের ভয়ে যে শিশু বিব্রত হয় না, সেও দেখি “জুজু” নামক অনির্দেশ্য পদার্থটিকে যথেষ্ট খাতির করিতে জানে।
এই অস্পষ্টতার আবরণ দিয়া মানুষ জীবনের সকল ক্ষেত্রেই নানারকম জুজু গুষিয়া থাকে। কতকগুলি পরিচিত নাম বা দু-দশটা প্রচলিত বচনকে গাম্ভীর্যের মুখোশ পরাইয়া এমন বড়-বড় আসনে বসাইয়া রাখে যে তাহাদের সম্বন্ধে তর্কবিচারের চেষ্টাও বেয়াদবির নামান্তর বলিয়া গণ্য হয়। ব্রহ্মচর্যের অক্ষয়মাহাত্ম্য অস্বীকার করিবার জো নাই। কিন্তু বালবিধবার প্রবোধচ্ছলে সে মাহাত্ম্যের উচ্ছ্বসিত কীর্তন যে অনেক স্থলেই জুজু দেখাইবার আড়ম্বর মাত্র এরূপ সন্দেহ করা অসঙ্গত নয়। ভারতের অধ্যাত্ম-সম্পদ কিছু অবাস্তব কল্পনা নয়, কিন্তু সাত্ত্বিকতা ও আধ্যাত্মিকতার বাহুল্য বর্ণনায় মন যে অকারণ সম্ভ্রমে ভরিয়া ওঠে, তাহা অনেক স্থলেই নিছক জুজুতন্ত্রের নিদর্শন মাত্র। মোটকথা, অস্পষ্ট তত্ত্ব ও অনির্দিষ্ট সংস্কারকে যথাসম্ভব স্পষ্ট ও গম্ভীর ভাষায় ব্যক্ত করিলে তাহাতে অল্পায়াসে অনেকখানি ফল পাওয়া যায়। তর্কস্থলে প্রতিপক্ষের মুখ বন্ধ করা যখন আবশ্যক হয়, তখন এইরূপ দু-একটি জুজুকে অকস্মাৎ আসরে নামাইলে, তাহার ফলটি হয় ঠিক চলন্ত রেলগাড়ির মুখে লালবাতি দেখাইবার অনুরূপ।
প্রবল তর্কের উৎসাহমুখে, “দিন আগে না রাত আগে?” বলিয়া সুকৌশলে একটি বিরাট সমস্যার অবতারণা করিলে, বেহিসাবী সাধারণ লোকে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত করিয়া বসে ইহার পরে আর তর্ক চলে না। কিন্তু স্পষ্ট-বুদ্ধির সতর্কতা কোমর বাঁধিয়া বলে যে তর্কবিচার করিতে হয় তো এইখানেই করা দরকার। এইখানেই বিশেষভাবে স্পষ্ট করিয়া বলা প্রয়োজন যে দিবারাত্রির এই আপাতভীষণ দ্বন্দ্বটা একটা নিতান্তই মোটা কৃত্রিম তর্ক মাত্র। দিন এবং রাত, ভিতর ও বাহিরের মতো, উত্তর ও দক্ষিণের মতো, কাগজের এপিঠ-ওপিঠের মতো, শাশ্বতকাল একই বাস্তব আইডিয়ার দুই মাথায় বসিয়া আছে। শাশ্বতকাল হইতে যেখানে যেখানে সূর্য প্রদীপ্ত হইয়াছে, সেখানে-সেখানেই নানা ছন্দে নানা বিচিত্রতালে দিবারাত্রির যমজলীলার অভিনয় চলিয়াছে। এই পৃথিবীও যখন আপনার স্বতন্ত্র জীবনে প্রথম সূর্যালোক প্রত্যক্ষ করিয়াছিল, তখন হইতেই আলো-আঁধারের একই চক্রে দিবা-রাত্রি গণনার সূত্রপাত হইয়াছিল। সেইরূপ “বীজ আগে না গাছ আগে” এই প্রশ্নেরও একটা সম্মোহন মূর্তি আছে। শুনিলেই মনে হয় একটা বিরাট নিরুত্তর সমস্যা, তাই মানুষ সসম্ভ্রমে পথ ছাড়িয়া দেয়। কিন্তু সতর্ক সহজ বুদ্ধি চোখে আঙুল দিয়া দেখায় যে জড় ও চেতনের সন্ধিমুখে জীবনের আদি উন্মেষ যেখানে, সেখানে বীজও নাই, বৃক্ষও নাই, কেবল আকার বৈচিত্র্যহীন জীবকোষ পরিপুষ্টির আতিশয্যে ফাটিয়া দু'খান হয়, “এক” সেখানে সাক্ষাৎভাবে "দুই" হইয়া বংশ বিস্তার করিতে থাকে। ক্রমে জীবন-রহস্যের জটিলতা যখন বাড়িয়া পরিণত ও অপরিণত জীবের প্রভেদ স্পষ্ট হইয়া ওঠে, জীবাবস্থা ও বৃক্ষাবস্থার স্বাতন্ত্র্যকল্পনা যখন সম্ভব হয়, তখন সেই একই সম্ভাবনার যুগলচিত্র বৃক্ষ ও বীজের অবিচ্ছিন্ন দ্বন্দ্বের মধ্যে যুগপৎ প্রকাশিত হয়। দ্বন্দ্বটা যে কি এবং তাহার প্রতিষ্ঠাভূমি কোথায়, এরূপ স্পষ্টভাবে ঘাটাইয়া না দেখিলে, তাহা যেকোনো ঝাপসা তর্কের ও নৈয়ায়িক আগাছার উর্বরক্ষেত্র হইয়া উঠিতে পারে। কার্যটা যেভাবে স্থূল ও সূক্ষ্ম কারণের মধ্যে বীজাকারে নিহিত থাকে, বৃক্ষটা ঠিক সেইরূপ সূক্ষ্মভাবে বীজের মধ্যে “একাধারে” “অপ্রকট” থাকে কিনা এবং বীজটা যদি উপাদান কারণ হয় তবে বৃক্ষের নিমিত্ত কারণটা ঐ বৃক্ষবীজ-সম্বন্ধেরই অঙ্গীভূত কিনা, কার্য ও কারণ এবং বৃক্ষ ও বীজ, কৃতকর্ম ও অকৃতকর্ম এবং বাস্তববৃক্ষ ও বৃক্ষসম্ভাবনা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments