রাজনারায়ণ বসু—আত্মচরিত

উনবিংশ শতাব্দীতে আদর্শের সংঘাতের দিনে নূতন শিক্ষা পেয়ে যে সমস্ত লোক জাতির ঘুমন্ত জীবনে চেতনার সঞ্চার করলেন তাঁদেরই একজন মনীষী রাজনারায়ণ বসু। রামতনু লাহিড়ী, শিবনাথ শাস্ত্রী এবং আরও অন্যান্য ব্রাহ্ম নেতাদের জীবনে আমরা দেখেছি যে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার সময় তাঁরা তাঁদের আত্মীয় স্বজন পিতামাতার কাছ থেকে বাধা কম পান নি। কিন্তু রাজনারায়ণ বসুর জীবন অন্যদের থেকে একটু পৃথক। তাঁর পিতা রামমোহনের সঙ্গী ছিলেন। তিনি চাইতেন পুত্র রাজনারায়ণ ব্রাহ্ম হোক। হিন্দুধর্মের তৎকালীন সংস্কারের জড়ভার থেকে তিনি মুক্ত হবার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাই নূতন চিন্তা গ্রহণের যে প্রাথমিক মানসিক সংঘাত, সেই সংঘাত তাঁকে সহ্য করতে হয়নি। কিন্তু পিতার আশ্রয় পেলেও অন্য বাধা তাঁকে কিছু কিছু পেতে হয়েছে। বিধবাবিবাহ দেবার জন্য তাঁর পিতৃব্যের সঙ্গে মনোমালিন্য হলো, জনসাধারণের একাংশ তাঁর উপর ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে, তবু সেই যুগের অন্যান্য যোদ্ধাদের মতো একটুও বিচলিত হননি তিনি। সেদিনকার বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে মনীষী রাজনারায়ণের প্রভাব অল্প ছিল না। একদিকে উৎকট পাশ্চাত্ত্যপ্রীতি অন্যদিকে গোঁড়ামীর পাঁকে আকণ্ঠ ডুবে থাকা—এ দুয়ের বাইরে ছিলেন তিনি। মধুসুদন আর ভুদেব এই দুই প্রতিক্রিয়ার মধ্যে স্থিরবুদ্ধি রাজনারায়ণ। হিন্দু কলেজের একই সময়ের এই তিন ছাত্রের মধ্যে বাঙ্গালীর মনের তিনটি ধারা ধরা পড়েছে।

রাজনারায়ণ বসুর ‘আত্মচরিত’ খুব সুখপাঠ্য গ্রন্থ নয়। শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মজীবনী যেমন পাঠকচিত্তকে নানা আকর্ষণে বেঁধে রাখে, দেবেন্দ্রনাথের আত্মজীবনী যেমন পাঠকের সামনে এক অপূর্ব সাধনার ইতিহাস উদঘাটিত করে, রাজনারায়ণের আত্মচরিত তেমন করে মনকে মুগ্ধ করে না, বিস্মিত করে না। ‘আত্মচরিত’-রচয়িতা এই কথাটি ভুলে গিয়েছিলেন যে তাঁর জীবনের কৃতিত্বঘোষণার স্থান ‘আত্মচরিত’ নয়। জীবনের বিকাশে লোকের কৌতূহল থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিকাশটা যখন বিশেষ কতকগুলো ঘটনার ভারে চাপা পড়ে যায় তখন সেই ঘটনাগুলো পাঠকের কাছে জীবনের গতিকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। আত্মপরিচয় যদি আত্মঘোষণা বা আত্মবিজ্ঞপ্তি হয়ে দাঁড়ায় তবে পাঠকের ঔৎসুক্য থাকে অতি অল্পই। রাজনারায়ণ বসু উনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধাংশের অতি সম্মানিত গুরুস্থানীয় পুরুষ। কিন্তু তাঁর আত্মচরিত তাঁর আত্মপ্রসাদের অত্যধিক উচ্ছ্বাসে পূর্ণ। বাংলার সাহিত্য-পাঠকদের মনে মনীষী রাজনারায়ণের যে ছবি ভেসে ওঠে সেই লোক তাঁর নিজের কথা বলতে গিয়ে আত্ম-উচ্ছ্বাসে ভরে উঠবেন এ কথা ভাবতে কষ্ট হয়। তাঁর রচনার প্রশংসায় কোন পত্রিকা কি বলেছে, কোন বন্ধু কি ভাষায় অভিনন্দন জানালেন, মেদিনীপুরবাসীর অভিনন্দন পত্র প্রভৃতির কথা অতি উৎসাহের সঙ্গে তিনি বলেছেন। আজকের পাঠকের কাছে সেই উদ্ধৃত সুবিস্তৃত অংশগুলির ঐতিহাসিক মূল্য ছাড়া অন্য কোন মূল্য নেই।

শ্রদ্ধেয় রাজনারায়ণ শুধু চিন্তাশীলতাতেই নয়, কর্মের কঠিন সাধনাতেও তাঁর পরিচয় রেখে গেছেন। এই কর্মবহুল জীবন কোন্ ভূমি থেকে রস সংগ্রহ করেছিল, কোথায় তার কর্মের প্রেরণা, পাঠক তার সন্ধান আত্মচরিতে পায়না। অথচ এই কর্মের জন্য যে সম্মান তিনি ভাল পেয়েছিলেন তার হিসাবের বাহুল্য ব্যক্তিটির প্রতি আমাদের কৌতূহলকে সীমাবদ্ধ করে তোলে। নিজের কথা যে লোক বেশী বলে সে যেমন অল্পক্ষণেই অন্যলোককে উত্ত্যক্ত কবে তোলে রাজনারায়ণের আত্মচরিত সেইরকম। যে আত্মকেন্দ্রিকতা উত্তীর্ণ না হলে আত্মচরিত সাহিত্য-পদবাচ্য হয়না রাজনারায়ণ সে আত্মকেন্দ্রিকতা উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাঁর সমসাময়িক কালও বিশেষ স্থান অধিকার করেনি। আত্মকথায় শুধু লেখক নন, তাঁর সমাজও জীবন্ত হয়ে ওঠে। তৎকালীন জীবনযাত্রার কিছু কিছু খবর যদিও রাজনারায়ণের গ্রন্থে আছে তা নেহাৎই বিবর্ণ, বিরস। তাঁর শিক্ষার বর্ণনা প্রসঙ্গে কয়েকজন অধ্যাপকের কথা বলেছেন। সকলের সঙ্গেই তাঁন হৃদ্যতা ও ঘনিষ্ঠতাব যোগ ছিল। তাঁর প্রতি তাঁদের অসীম স্নেহ ছিল সেই কথাটি কোথাও কোথাও প্রধান হযে উঠেছে। তাঁর পুরাবৃত্ত সম্বন্ধে প্রবন্ধ পাঠ করে ‘বেঙ্গল হেরাল্ডে’ যে মন্তব্য প্রকাশিত হয় তা তিনি যথাযথ তুলে দিয়েছেন। পাঠকের কাছে,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice