ময়না বউদি

শহরের একটা গলি। দু’টো বাড়ী সামনাসামনি। মাঝখানে তিন সাড়ে তিন গজের ব্যবধান। একতলার জানালা দু’টোও মুখোমুখি। সামনের জানালা দিয়ে দেখা যায় দেয়ালে একটা আয়না টাঙানো। ঘরটায় জিনিষপত্র খুব কম; একটা খাট, পিড়ি, তাকের উপর কয়েকখানা বই, তেল চিরুণী। দেয়ালে দু’য়েকটি ছবি।

ছোট ঘর। একটি মেয়ে ছাড়া আর কারো মুখ ক্বচিৎ চোখে পড়ে এ ঘরে। সে কখনো সেলাই করছে বা বই পড়ছে বসে বসে, কখনো মাথা নিচু করে চুপচাপ মগ্ন হয়ে রয়েছে নয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুলে চিরুণী বোলাচ্ছে। দিনে কয়েকবার যত্ন করে চুল বাঁধে মেয়েটি। বাড়ির সকলের ধারণা মেয়েটা চিরুণী-পাগল।

দীঘল চুল। চুলের দৈর্ঘ দেখতে যখনি সে পিছন ফেরে, দেখে চুল তার গোড়ালি ছুঁয়েছে। এইটুকু বলা যায় যে সে নিজের চুলের জন্য গর্বিত। আলোর ঔজ্জ্বল্য সম্বন্ধে যেমন কোন সন্দেহ নেই, চুল নিয়ে মেয়েটির গর্ব তার চেয়েও নিঃসন্দিগ্ধ।

যুবতী দীর্ঘাঙ্গী। সুন্দরী। সামনের জানলা থেকে চোখের রঙ দেখা না গেলেও তার রূপ বড় বিষণ্ণ, মধুর।

কে জানে, সারাদিনে কতক্ষণ সে জানলায় বসে বসে চোখের জল ফেলে কিন্তু কখনো কারো দিকে তাকায় না। অবশ্য গলির অন্য নারীরা টের পায়। কেউ ওদিক দিয়ে আসা যাওয়া করার সময় সাড়াও দেয়।

কথা বলে মিষ্টি গলায় মাথা নিচু করে।

সে ঘরে না থাকলে জানলা বন্ধই পড়ে থাকে, অথচ শীতের বিকেলে বা গরমকালের বেলা বারোটার ঝাঁঝ। দুপুরে জানলা ঠিক খোলা। সে জানলার কাছে পিছন ফিরে বসে মাঝে-মাঝে গলিটায় উঁকি দেয়।

গলির মোড়ে বইয়ের থলি কাঁধে একটা বাচ্চা ছেলেকে ফিরতে দেখা যায়। মেয়েটি সব কাজকর্ম ফেলে জানলার শিকের ফাঁকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটা কখনো কখনো মুখ তুলে তাকায় তারপর সোজা ঢুকে পড়ে বাড়িতে। ছেলেটার সিঁড়ি দিয়ে ওঠা জুতোর শব্দ কান পেতে শোনে। যদিও মেয়েটি কোনোদিন ওদের বাড়ি যায়নি তবু ওদের সিঁড়িতে কতগুলো ধাপ তা ওর জানা। প্রতিটি ধাপের আওয়াজ শুনতে শুনতে কখনো সে নিজের বুক চেপে ধরে।

ও বাড়িতে কোনো দরজা খোলা হলেই সে বুঝতে পারে বৈঠকখানায় কেউ এসেছে।

বইখাতার থলে একধারে রেখে ছেলেটা নিজের জানলা খানিকটা খুলে সামনের জানলার দিকে তাকায়। মেয়েটি সেদিকে তাকায় না—কেননা সে জানে দু’টি চোখ তারই দিকে নিবদ্ধ। সেই চোখ, যার পথ চেয়ে সে বসে থাকে, যে কোনোদিন ফিরতে দেরী করলে অন্য ছেলেদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, ওর এত দেরী হচ্ছে কেন? যদিও প্রশ্নটা সে কাউকে করেনি।

খোকা বৈঠকখানার দরজা বন্ধ ক’রে উপরে চলে যেত।

এমনি করে দিনের পর দিন কেটেছে। খোকার বয়স এখন তেরো। সামনের জানলার প্রতি কৌতূহল এখন একধরণের নতুন আস্বাদ জাগায় ওর মনে।

একদিন খোকা মাকে জিজ্ঞেস করে, “আমাদের বাড়ি সকলেই তো আসে কিন্তু সামনের বাড়ির কেউ আসেনা কেন?”

“আমাদের গলিতে এরাই একমাত্র জৈন পরিবার। এরা মাছ-মাংস ছোয়না তাই শিখদের বাড়ি আসা-যাওয়া নেই।”

“কিন্তু মা, আমরা তো মাংস খাইনে।”

“এঁদের ধারণা সব শিখেরাই আমিষ খায়।”

“বাড়ি থেকেও বেরোন না?”

“মাঝে মাঝে বেরোন। বড় দুঃখ গেছে এদের মাথার উপর দিয়ে।পর পর দু'জন মারা যাওয়ার ওদের সংসারটা তছনছ হয়ে গিয়েছে। একমাত্র ছেলের বিয়ে দিল, দু’বছর যেতে-না-যেতে মারা গেল সে। ছেলেটি মারা যাওয়ার পর একটা বাচ্চা হয়েছিল, বছরখানেকও বাঁচলো না। এখন তিনটি বিধবা যেন শুধু কান্নাকাটি করার জন্য বেঁচে আছে।”

“বাচ্চাটা কার?”

“ময়নার। তাকে তুমি নিশ্চয়ই জানলায় বসে থাকতে দেখেছ।”

“ও সব সময় জানলায় বসে থাকে কেন মা?”

“জোয়ান মেয়ে বিধবা হলে বড় চোখে চোখে রাখে এরা...আর এদের সংসারে কাজের ঝক্কিও বেশী নেই।”

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion