কাজী নজরুল ইসলাম: ‘দুই সমুদ্রের মিলন’
ফারসি ভাষার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় আশৈশব। সম্ভবত ছোটোবেলায় পারিবারিক পরিবেশে ফারসির সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। পরে তাঁর চাচা বজলে করিমের কাছেই তিনি সত্যকার ফারসি চর্চা শুরু করেন। মুজফ্ফর আহ্মদের কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা থেকে জানতে পারি, পরে শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে হাফিজ নূরুন্নবীর কাছে তিনি ভালোভাবেই ফারসি-চর্চা শুরু করেছিলেন। নূরুন্নবীরই অনুপ্রেরণায় ক্ল্যাসিকাল ভাষা হিসাবে সংস্কৃত ত্যাগ করে ফারসি গ্রহণ করেন (অর্থাৎ সংস্কৃত তিনি পঠনীয় বিষয় হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছিলেন; বাংলা শব্দ-ভাণ্ডারে তাঁর অনায়াস অধিকারের এটি একটি সম্ভাব্য কারণ বলে মনে হয়)। নূরুন্নবী শুধু ফারসি ভাষা ও ব্যাকরণেই নয়, ফারসি কাব্যেও সম্ভবত নজরুলকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এই পাথেয় অবলম্বন ক’রে নজরুল করাচির সেনানিবাসে এক পাঞ্জাবি মৌলভী সাহেবের কাছে (নজরুল সম্ভবত কোথাও তাঁর নাম বলেননি বলে, একটি নতুন অদ্ভুত জগতে যিনি তাঁকে নিয়ে গেছিলেন তাঁর নাম আমরা কোনোদিন জানতে পারলাম না) ফারসি কাব্যের পাঠ গ্রহণ করেন। এর ফলে তিনি ফারসি কবিদের রচনায় গভীরভাবে আকৃষ্ট হন; মনে হয় তাঁকে সব থেকে বেশি আকৃষ্ট করেছিলেন ওমর খৈয়াম, রুমি, সা’দি এবং হাফেজ, এবং অবশ্যই হাফেজ ছিলেন তাঁর প্রিয়তম কবি।
নজরুল বিদ্রোহী পর্বের (১৯২০-২১) প্রাক্-কলকাতা যুগে করাচির সেনানিবাসে অবস্থানকালে (১৯১৭-১৯) যে-সাহিত্য রচনার সূত্রপাত করেছিলেন, তাঁর সমগ্র রচনায় তার যে-ছায়াপাত ঘটেছিল, সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। এই সাহিত্য-চর্চার একদিকে ছিল রবীন্দ্র-কাব্য, বিশেষ ক’রে তাঁর গান, অপরদিকে ছিল ফারসি সাহিত্য। আমরা সেই যুগেই তাঁর ব্যথার দান-এ (১৯১৯) উল্লেখ পাই সা’দির গোলেস্তান ও বোস্তান-এর১। বলাবাহুল্য গোলেস্তান ও বোস্তান সা’দির বিশ্ববিশ্রুত গ্রন্থের নাম। তাঁর সা’দির রচনা পাঠ সম্পর্কে পরে আরো বলছি। নজরুল ঐসব রচনায় ‘সাধকশ্রেষ্ঠ প্রেমিক রুমির’ (নজরুলেরই ভাষা) গজল উদ্ধৃত করেছেন:
ওগো প্রিয়তম! তুমি যত বেদনার শিলা দিয়ে
আমার বুকে আঘাত করেছ, আমি তাই দিয়ে যে
প্রেমের মহান মসজিদ তৈরী করেছি।[২]
রুমির জগদ্বিখ্যাত মসনভী থেকে প্রথম কয়েক ছত্রের বাংলা অনুবাদ (বলা ভালো verse- paraphrase) বঙ্গনূর পত্রিকার ১৩২৭ (১৯২০) সালের কার্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। রুমির “বেশনু আজ ন্যায় চুঁ হেকায়েৎ মি কুনাদ/ওয়াজ জুদাঈহা শেকায়েৎ মি কুনাদ” এই দ্বিপদী-কে নজরুল বাংলায় রূপান্তরিত করেছিলেন এইভাবে—“শোন দেখি মন বাঁশের বাঁশীর বুক ব্যেপে কি উঠছে সুর/সুর তো নয় ও, কাঁদছে যে রে বাঁশরী বিচ্ছেদ বিধুর”৩। কিন্তু হাফেজের গজল-সাহিত্যে তাঁর সেকালের রচনা ছিল একেবারে সম্পৃক্ত। ব্যথার দান-এ তিনি হাফেজের জন্য বলছেন, “শিরাজের বুলবুল”৪। আর রিক্তের বেদন গ্রন্থের ‘সালেক’ গল্পটি তো হাফেজের এক গজলেরই কাহিনিরূপ। সেখানে যে-দরবেশের কথা বর্ণনা করা হয়েছে তিনি তথাকথিত শাস্ত্রতাড়িত ধার্মিক নন, কিন্তু পরম ঈশ্বর-প্রেমিক। ঐ বয়সের রচনাতেই নজরুল হাফেজের উদ্ধৃতি দিয়ে দরবেশের মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন—“বমে সাজ্জাদা রঙীন কুন গরৎ পীরে মাঁগা গোয়েদ/কে সালেক বেখবর না বুদ জে রাহ ও রসমে মঞ্জেলহা,” যেটা তাঁরই বাংলায় দাঁড়িয়েছে: “জায়নামাজে শারাব-রঙীন কর, মুর্শেদ বলেন যদি/পথ দেখায় যে জানে সে যে, পথের কোথায় অন্ত আদি”।৫ (প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, এই চরণগুলি যে গজলের অন্তর্ভুক্ত—দিওয়ান-ই হাফেজ-এর প্রথম গজল—সেটি শুনতে শুনতেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন)। শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় যে ঐ দরবেশই হাফেজ। “তুমি কে?” এই প্রশ্নের উত্তরে ঐ-গল্পের শেষ বাক্যে জবাব পাওয়া গেল: “খেয়া পার হতে খুব মৃদু একটা আওয়াজ কাঁপতে কাঁপতে কয়ে গেল, “মাতাল হাফিজ!”৬ করাচি থেকে ফেরার সময় তাঁর সঙ্গে যেসব জিনিসপত্র ছিল তার মধ্যে ছিল রবীন্দ্র-সংগীতের স্বরলিপি এবং দিওয়ান-ই-হাফিজ-এর মূল ফারসি পাঠ সহ উর্দু অনুবাদ (সম্ভবত পাঞ্জাবি মৌলভী সাহেবের দেওয়া উপহার)। এই দুই সাহিত্যের দুই মহান কবির পদধ্বনি তাঁর সাহিত্য জীবনের শুধু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments