অতীত আলোচনা
শুরু
এ পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার পরই কেবল জাসদের মধ্যে আত্মসমীক্ষার একটা প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে। তবে ’৭৪-এর ১৭ই মার্চ থেকে ’৭৫-এর ৭ই নভেম্বর সময়টাতে সম্ভবত এই সমীক্ষার একটা পূর্বারম্ভও ছিল। কারণ,
ক) “১৭ই মার্চের পূর্বে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো সম্পর্কে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, বিপ্লবের স্তর সম্পর্কে আমাদের কোন সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল না। স্বভাবতই শত্রু-মিত্র নির্ধারণ ও আন্দোলনের রূপরেখা সম্পর্কে আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা ছিল অনুপস্থিত।”
[জাসদের দ্বিতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ কর্তৃক উত্থাপিত ‘রাজনৈতিক রিপোর্ট’, পৃষ্ঠা ১৪: 29/3/80]
অথবা, খ) “বস্তুত ১৭ই মার্চ ১৯৭৪-এ আমরা কি করতে চেয়েছিলাম? তখনকার সাহিত্যগুলো খুঁজে দেখলে মূলত একটি জবাব বেরিয়ে আসবে! গণআন্দোলনের ছেদ ঘটিয়ে তাকে বিপ্লবী আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে। অন্যান্য কিছু টুটকো কথাবার্তা বলেছিলাম বটে, কিন্তু সেটা আসলে ধর্তব্যের মধ্যে আসতে পারে না। তখন পার্টির থিসিস ছিল না। রণনীতি রণকৌশল ছিল অনির্ধারিত।”
[জাতীয় কমিটি কর্তৃক কেবলমাত্র সদস্যদের জন্য প্রচারিত আত্মসমালোচনামূলক ৪৪ পৃষ্ঠার দলিল, পৃ. ২০: ১৮/৩/৭৮] আরও, গ) “পার্টি থিসিস নেই (মার্কসবাদ, লেনিনবাদের কথা বলছি)। প্রলেতারিয়েত শক্তিভিত নেই। এ অবস্থায় আন্দোলনের চূড়ান্ত কি হতে পারে? ক্ষমতা দখল? কার? জাসদের? এগুলো কোন কিছুই নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ আন্দোলন এগিয়ে যেতে লাগলো।” (ঐ, পৃ. ১৯)
১৭ই মার্চ এবং ৭ই নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জাসদের মধ্যে পার্টি থিসিস উত্থাপিত হয়েছে, সেটা সংশোধিত (পরিমার্জিত)ও হয়েছে, কিন্তু তবুও,
ঘ) “আমরা ভুল করেছি এবং তা থেকে মূলত কোন শিক্ষা গ্রহণ করিনি। তার প্রমাণ হলো উপরের ঘটনাগুলো (১৭ই মার্চের পর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এবং তৎপরবর্তী—লেখক)। কিন্তু সবচাইতে জাজ্বল্যমান নিদর্শন হলো আরো পরে, নভেম্বরের বিপর্যস্ত দিনগুলোতে।
ইতিমধ্যে পার্টি থিসিস (সংশোধিত আকারেও) এসেছে, রণনীতি, রণ-কৌশলের ব্যাপারে বক্তব্য রাখা হয়েছে, তথাপি আন্দোলন রচনার ক্ষেত্রে এক আশ্চর্য শূন্য বার্তার[১]পরিচয় দিলাম।”
[88 পৃষ্ঠা দলিল: পৃষ্ঠা ২৫-২৬] অথবা, ঙ) “অপরিবর্তিত রণকৌশল অব্যাহতভাবে চালু থাকা অবস্থাতেই ৭ই নভেম্বরের সিপাহী অভ্যুত্থান ঘটে।” [শাজাহান সিরাজ, রাজনৈতিক রিপোর্ট, পৃষ্ঠা ১৫]
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চের আগে জাসদের মধ্যে ‘বিপ্লরের স্তর’, ‘রণনীতি’, ‘রণকৌশল’, ‘বিপ্লবের শত্রুমিত্র’, আন্দোলনের রূপরেখা’ এইসব সম্বন্ধে ধারণাগুলোই ছিল অনুপস্থিত। আর পরে যদিও ‘পার্টি থিসিসে’র মাধ্যমে এই ধারণাগুলো আনার প্রয়াস হয়, কিন্তু তা দলের বাস্তব কর্মকাণ্ডে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারে না।
জাসদের ক্ষেত্রে নভেম্বরের পর থেকে যে আত্মসমীক্ষার শুরুর কথা বলা হলো, অন্য কথায় সেটা হলো জাসদের মধ্যে বিপ্লব সম্বন্ধে আরও একটু গভীরভাবে চিন্তাভাবনার শুরুর প্রসঙ্গে। যেহেতু ‘বিপ্লবের স্তর’, ‘রণনীতি’, ‘রণকৌশল’ ইত্যাদি ধারণাগুলো বিপ্লব সম্বন্ধে একটু গভীরভাবে চিন্তার সহায়ক, শুধুমাত্র এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্ভবত উল্লিখিত ‘পূর্বারম্ভে’র কথাটা বলা গেলেও বলা যেতে পারে।
যা হোক, ১৯৭৪-এর ১৭ই মার্চের ঘটনার পর প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সাম্যবাদ’। ‘সাম্যবাদ’-এ ১৭ মার্চের ঘটনাকে তুলনা করা হয় ১৯০৫-র মস্কো অভ্যুত্থানের সাথে। (তুলনায় অবশ্য আরও ছিল মনকাডা দুর্গ আক্রমণ, ৪ঠা মে’র আন্দোলন ইত্যাদি)। ‘সাম্যবাদ’ দ্বিতীয় সংখ্যায় দেয়া হয় মাও সেতুং-এর উদ্ধৃতি: দেশে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এখানে সংগ্রাম অর্থ যুদ্ধ আর সংগঠন মানে সেনাবাহিনী। সাম্যবাদের কথার সাথে সঙ্গতি রেখে দ্রুত গড়ে উঠতে থাকে ‘গণবাহিনী’। গোটা এই প্রক্রিয়াটা চরমে গিয়ে ঠেকে ৭ই নভেম্বরের ঘটনাবলীতে।
যখন একদিকে অবশেষে রাষ্ট্রক্ষমতা যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য হাতে এসেও হাতে থাকলো না (!) অন্যদিকে এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে হারাতে হলো প্রাণ, গোটা জাসদ নেতৃত্বকে সম্মুখীন হতে হলো দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের, গণবাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্টদের হতে হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষের মুখোমুখি।
এই ক্লাইমেক্সের পর আত্মসমীক্ষার ব্যাপারটার সিরিয়াস চরিত্র পাওয়া ছাড়া উপায় ছিল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments