মার্কসের সমাজ-তত্ত্ব

আঠারো শতকের ফারসী বস্তুতন্ত্রীদের মত ছিল, সমাজকে নিয়ন্ত্রণ এবং শাসন করে জনমত (public opinion); এই জনমত সমাজ-পরিবেশের সৃষ্ট, ইহার প্রকাশ হয় রাষ্ট্র-বিধির ভিতর দিয়া। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক হইতেই এই মত বর্জিত হইতে লাগিল।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক Guizot বলিলেন, অধিকাংশ লেখক সমাজের বিকাশের মূল খুঁজিয়া বাহির করিয়াছেন রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভিতরে। ইহাদিগকে বিচারের মূল বিসয় না করিয়া গোড়ায় সমাজকে বুঝিবার চেষ্টা করিলেই বুদ্ধিমানের কাজ হইত। তিনি ইহাও বলিয়াছেন, রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠাগুলি কারণ হিসাবে কাজ করিবার পূর্বে অন্য কতকগুলি কারণ হইতে ইহাদের উদ্ভব হইয়াছে। সমাজকে ইহারা নিয়ন্ত্রণ করে বটে, কিন্তু প্রথমত সমাজই ইহাদিগকে জন্ম দিয়াছে। ঐতিহাসিকের দৃষ্টি সর্বপ্রথম আকর্ষন করিবে সমাজের বিভিন্ন পরিবর্তন, স্তর এবং অবস্থাগুলি, কেননা বিভিন্ন লোকের এবং শ্রেণীর পরস্পর সম্বন্ধে নির্ধারিত হইবে এইসব পরিবর্তন দ্বারা। কীভাবে শাসনকার্য রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাহার পূর্বে বুঝিতে হইবে কি প্রকারে সমাজের লোকগুলি জীবনযাপন করে।

Guiz আরো খানিকটা অগ্রসর হইয়া বলিলেন, আধুনিক জাতিগুলির জীবনে দেখা যায়, জমি-সম্পর্কিত বিষয়ের সহিত মানুষের জীবন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সুতরাং জাতির রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে গবেষণার পূর্বে জমি-সম্বন্ধীয় আলোচনাই প্রথম কর্তব্য। Guizot এই দৃষ্টির সাহায্যেই Merovingian এবং Carlovingian দের সময়কার ফরাসী-ইতিহাস লিখিয়াছেন। আরো কিছুটা অগ্রসর হইয়া ইংল্যান্ডের বিপ্লব সম্পর্কে তিনি লিখিয়াছেন, এই বিপ্লব আধুনিক সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীগুলির সংঘর্ষেই একটি চিত্র। এখন হইতে Guizot জমি সম্পর্কের (Land relations) জায়গায় বিত্ত-সম্পর্কেই (property relations) রাজনৈতিক আন্দোলন এবং বিপ্লবের মূলীভূত কারণরূপে ধরিলেন।

Augustin Thierry-ও একই মতে আসিয়া পৌঁছিলেন। ইংল্যান্ড এবং ফরাসীর ইতিহাস আলোচনায় তিনি দেখাইয়াছেন, রাষ্ট্রনৈতিক বিকাশের মূল কারণ সামাজিক বিকাশ। এই কারণটি সাধারণত লোকচক্ষুর অন্তরালেই লুক্কায়িত থাকে। ফরাসী বস্তুতন্ত্রীদের মতো তিনি বলেন নাই যে জনমতই জগতকে চালাইতেছে। জনমতের সংজ্ঞা তিনি দিয়াছেন, ইহা স্বার্থেরই প্রকাশ এবং স্ফুরণ। ইংল্যান্ডে চার্লস প্রথমের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের সংগ্রাম সম্পর্কে Thierry খুব বিশেষত্ব-পূর্ণ আলোচনা করিয়াছেন। বিবদমান দুইটি দলের একটির লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতা এবং বিলাস-সম্ভোগ; অপরটির আদর্শ ছিল স্বাধীনতা অর্জন এবং শারীরিক শ্রম দ্বারা উৎপাদন। রাজার পক্ষে যোগ দিল বিলাস এবং সম্ভোগ ছাড়া জীবনে অন্য কিছু যাহাদের ভাবিবার প্রয়োজন ছিল না। উৎপাদনের সঙ্গে যাহাদের যোগ ছিল তাহারা ‘কমন্স’ আখ্যা পাইল। স্বার্থ লইয়াই এই দুই দলে সংগ্রাম বাঁধিয়াছিল। রাজার বিপক্ষে যাহারা যুদ্ধ করিয়াছিল ধর্ম-বিশ্বাসের দিক হইতে তাহারা প্রিসবিটেরিয়ান শ্রেণীভুক্ত। ধর্মের ব্যাপারে কোন রকমের জোয়াল ঘাড়ে বহন করিয়া চলিতে ইহারা অনিচ্ছুক। অপর পক্ষীয়রা ধর্ম-বিশ্বাসের দিক হইতে ছিল এপিস্কোপেলিয়ান। অর্থাৎ ধর্মকার্যে ইহারা চায় কতিপয়ের কর্তৃত্ব এবং ধর্মের নামে ট্যাক্স আদায়ের সুযোগ।

বাহ্যত মনে হয় Thierry বুঝি পরিষ্কারভাবেই সকল কথা বলিয়াছেন, কিন্তু বস্তুত তাহা নয়। কি সূত্র-অনুসারে শ্রেণীস্বার্থ বিশেষ একটি রূপ পরিগ্রহ করে তাহা কি তিনি বলিতে পারিয়াছেন? কি হেতু সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর জন্ম হয়, সে সম্পর্কে কোনও নির্দেশ তাহার নিকট আমরা পাই না।

Guizot এবং Thierry-র পরে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক Mignet। কিন্তু তিনিও বেশিদূর অগ্রসর হইতে পারেন নাই। অবশ্য ইহারা সকলেই এতটুকু ধারণা করিয়াছিলেন যে সমাজ-বিকাশের মূলতত্ত্বটি অর্থনৈতিক বিষয়ের ভিতরেই খুঁজিতে হইবে। ফরাসী বিপ্লব ছিল বুর্জোয়া অভিজাত স্বার্থের সংগ্রাম; এই সংঘর্ষের পরে ঐতিহাসিকগণের এতটুকু ধারণা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়। ফরাসী-বিপ্লবের পর ‘Restoration’ যুগের ঐতিহাসিকেরা বিনা দ্বিধায় অতি সহজেই ‘শ্রেণীসংঘর্ষ’ থিওরিটির প্রতি তাহাদের যথেষ্ট সহানুভূতিই ছিল। রক্তের এবং রক্তপাতের ভয় তাহাদের সে সময়ে বড় একটা ছিল না। ঞযরবৎং তাহার ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাসে পরিষ্কারই বলিয়াছেন, ‘So I repeat war i. e. revolution, was essential. God gave Just icemen only at the price of struggle.’ মধ্যবিত্তশ্রেণী যতদিন পর্যন্ত অভিজাতবর্গের বিরুদ্ধে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice