নিষ্ফলা

—আ মর! এগিয়ে আসছে দেখো না। দূর হ, দূর হ। ওমা আমি কোথায় যাব? এ যে ঘরে আসতে চায়। ছিঃ ছিঃ! ধম্ম-কম্ম সব গেল। বলি ও ভালোমানুষের মেয়ে, এমনি করে কী লোককে পাগল করতে হয়?

বেলা বেশি নয়, আটটা হইবে প্রায়। বৈশাখ মাস—বেশ রৌদ্র উঠিয়াছে। পাশের বাড়ির গৃহিণী আহ্নিক করিতে বসিয়াছেন তাঁহার পূজার ঘরে। পূজার ঘরটি ত্রিতলে। সেইখানে বাড়ির দুষ্ট কুকুরটি দরজায় আসিয়া উঁকি মারিল। নামাবলিতে সর্বাঙ্গ ঢাকিয়া ছোটো একটি আরশি দেখিয়া নাকের উপর তিলক কাটিতে কাটিতে কুকুরের মুখ দর্শন করিয়া তিনি শিহরিয়া উঠিলেন। তাঁহার হাত হইতে সশব্দে তিলক-মাটি পড়িয়া গেল। তিনি তখন পূজায় বাধা পড়িতে দেখিয়া চকিতে ঠাকুরঘরের দরজাটি বন্ধ করিয়া ভীত-কণ্ঠে ওই কথাগুলি বলিতে শুরু করিলেন। নীচের তলায় বধূটি স্নান করিতেছিল, সে মুহূর্তে ভিজা কাপড়েই দৌড়াইতে দৌড়াইতে উপরে আসিয়া কুকুরটিকে কোলে লইয়া বলিল—বেবি, তুই বড়ো দুষ্টু হয়েছিস। একদিন না এখানে আসতে বারণ করেছি।

কথা-শেষে সে বেবির পিঠে মৃদু করাঘাত করিল। বেবি ভারি খুশি হইয়া লেজ নাড়িতে নাড়িতে একবার ডান দিকে একবার বাঁ-দিকে ফিরিয়া ডাকিল, ঘেউ-ঘেউ!

বিপদ কাটিয়া যাইতে দেখিয়া শাশুড়ি নির্ভয়ে পুনরায় পূজার ঘরের দরজা খুলিয়া দিলেন; বধূকে বলিলেন, দেখো গা বাছা, কুকুরকে অত আদর দেওয়া ভালো নয়। কথায় আছে না, কুকুরকে লাই দিলে মাথায় ওঠে! সব জিনিসের একটা সীমা আছে।

বধূটি প্রতিবাদ করিল, কী অত আদর দিতে দেখলেন?

—ওই তো, তোমাদের সব তাতেই তক্ক। একটা কুকুরকে কোলে করে ধেই ধেই করে নাচাটা খুব ভালো, না?

বধূ আর কোনো কথা না-বলিয়া কুকুরটিকে লইয়া সেখান হইতে চলিয়া গেল।

গল্পটি আরম্ভ করিবার পূর্বে একটু গোড়ার কথা বলা দরকার। মাস-দুয়েক আগে পঞ্চাননতলার একটি সংকীর্ণ গলিতে সকালবেলা হইহই পড়িয়া গেল। সেই গলির মধ্যে ডাস্টবিনের কাছে কাহাদের একটি কুকুরের ছানা পড়িয়া রহিয়াছে। বয়স তাহার বেশি নয়, এখনও চোখ ফোটে নাই। বেচারা ঈষৎ নড়িয়া-চড়িয়া মৃত্যুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিতে লাগিল। কাহার এই দুঃসাহস যে নিঃশব্দে রাত্রিকালে চুপি চুপি নিষ্ঠুরের মতো এই দুর্ভাগা ছানাটিকে এইরূপে ফেলিয়া যাইতে পারিল? ছানাটির মৃত্যু সুনিশ্চিত। প্রথমত না-খাইয়া মরিতে পারে— দ্বিতীয়ত কোনো শত্রুর আক্রমণেও মরিতে পারে। অগত্যা বেচারাকে রক্ষা করিবার জন্য সকলে আকুল হইয়া পড়িল, অথচ কেহই সাহস করিয়া তাহার ভার লইতে চাহিল না। পরিশেষে ওই বধূটির স্বামী-স্ত্রীর সনির্বন্ধ অনুরোধে ভিজা গামছা পরিয়া কুকুরটিকে নিজ গৃহে লইয়া গেল। নিঃসন্তান বধূটি তাহাকে মাতার স্নেহে পালন করিতে লাগিল। কৃষ্ণের জীবটি’-র উপর তাহার অনুর্বর জীবনের স্নেহবাৎসল্যের প্রবল বন্যা বহাইয়া দিল। দিনে দিনে তাহার সুপ্ত স্নেহ ওই কুকুরটিকে জড়াইয়া বিরাট মহীরূহ সৃষ্টি করিতে লাগিল। কুকুরটির নামকরণ হইল ‘বেবি’। কিন্তু এই বেবিকে উপলক্ষ্য করিয়া বধূটির সহিত তাহার শাশুড়ির মনোমালিন্য হইল। শাশুড়ি প্রাচীনপন্থী বিধবা মানুষ। তিনি তাঁহার পূজা-আহ্নিক লইয়া দিনের চব্বিশটি ঘণ্টা কাটাইয়া দেন। সংসারে তাঁহার আক্ষেপ নাই। ভোর রাত্রে অন্ধকার থাকিতে থাকিতে গঙ্গাস্নানে বাহির হইয়া যান, রোদ উঠিলেই ফিরিয়া তাঁহার ত্রিতলের ঠাকুরঘরে প্রবেশ করিয়া গৃহদেবতার সেবা করেন। সন্ধ্যায় নিত্য বৈষ্ণব বাবাজিরা হরিনাম করিয়া গৃহ পবিত্র করিয়া যায়। বারো মাসে তেরো পার্বণ। গঙ্গাজল আর গোময় লেপন করিতে করিতে সারা বাড়ি শুদ্ধ করিয়াই কাটাইয়া দেন। এ হেন শাশুড়ি ওই অপবিত্র প্রাণীটি টিকে তাহার সুপবিত্র গৃহে কলুষিত করিতে দেখিলে সে খড়গহস্ত হইবেন তাহাতে আয় আশ্চর্য কী? বধূটি শাশুড়িকে যে অমান্য করে তাহাও বলা যায় না, কিন্তু এক্ষেত্রে কেন জানি না সে বাঁকিয়া দাঁড়াইল। তাহার স্বামী অকস্মাৎ আশ্চর্যরূপে মূক হইয়া পড়িল। যেমন বেবি দিন দিন শশীকলার ন্যায় বাড়িতে লাগিল

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice