'সোনার তরী' অপসারণ
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
'অ্যাটলাস' থেকে আমি নেমে যাবার পরে সেটা স্থান বদল করে পুনরায় নোঙর ফেলে ডুবে থাকা জাহাজের উপরে অবস্থান নিল।
'সোনার তরী'র সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য সেটার দৈর্ঘ্য বরাবর সামনের ও পিছনের দুই প্রান্তে ভাসমান সংকেত বসানো হল। জাহাজের স্থান বদলের সময় সেগুলো তার সাথে সাথে নড়াচড়া করেছিল। সবকিছু প্রস্তুত করে লক্ষ্যবস্তুর উপর ডুবুরী নামানো হল। অ্যাটলাসের ইঞ্জিন ও প্রপেলার পরীক্ষা করে কোনো ক্ষয়ক্ষতি পাওয়া যায় নি। ডুবন্ত 'সোনার তরী'র খোলের ভিতরকার স্থানগুলোতে কিছুটা পলিমাটি ভরে থাকলেও, কোনো মালামাল ছিল না। 'অ্যাটলাসের' অবস্থান ছিল মাঝনদী থেকে কিছুটা বাঁয়ে।
জন্নোতিন্ মানচিত্র নিয়ে আমার কাছে চলে এলেন। দুই জাহাজ সহ অন্যান্য সরঞ্জাম মানচিত্রে চিহ্নিত করার পরে দেখা গেল, ডুবে-থাকা জাহাজের নিচ দিয়ে পোন্টুনের রশ্মি টেনে নেবার সময় আবার ভাঁটা চলে আসায়, 'সোনার তরী' ৮০ ৯০ মিটার সরে গেছে। তার সামনেই নদীর তলদেশে পাথরের ঢিবি ছিল। আমি নির্দেশ দিলাম 'সোনার তরী'কে রশি দিয়ে অন্য আরেকটি ডুবন্ত জাহাজের ভাঙ্গা অংশের সাথে বেঁধে রাখতে। এরপর বাকি কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী চললো।
['সোনার তরী'তে পোল্টন বাঁধার কাজ।]
এসব কথা আমি বন্দর-পরিচালককে জানালাম, এবং তাঁকে নিয়ে আমি আবার 'অ্যাটলাসে' উঠে গেলাম। বন্দরে আগমনকারী আরেকটি জাহাজ লক্ষ্য করে দেখা গেল, সেটা অন্য সব জাহাজের তুলনায় অধিক বাঁক নিয়ে অন্য গতিপথে বন্দরে ঢুকছে। তখনি বন্দরের কাছেপিঠের জলসীমায় পানির গভীরতা বেশ কম হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করে সে সব পরিবর্তন মানচিত্রে এঁকে নেবার সিদ্ধান্ত এল। "অ্যাটলাসের' অবস্থানের তথ্যগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হলো। তবে শেষ পর্যন্ত 'সোনার তরী' নড়ে উঠেছে দেখে খুশি হলেন বন্দর-পরিচালক। যতটুকুই সরে আসুক 'সোনার তরী' তা বড় শ্রেণীর জাহাজের বন্দরে প্রবেশ করাটা সহজ করে দিয়েছিল, আর ২০শে মে তারিখে চট্টগ্রাম বন্দরকে পুরোপুরি সচল বলে ঘোষণা করা হল। ৫৫০ ফিট পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের জাহাজ সহজে বন্দরে আসা-যাওয়া করবে। এই সাফল্য আমাদেরকে 'সোনার তরী' উপর কাজ করতে আরো অধিক উৎসাহ যোগালো।
[পোন্টুনের মাধ্যমে ডুবে-যাওয়া 'সোনার তরী'-কে তুলে আনা হচ্ছে।]
এই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আমাদের সকল কার্যক্রম, যেমন: জাহাজ উত্তোলনের কাজে দীর্ঘসূত্রতা, মাইন নিষ্ক্রিয়করণে অস্বচ্ছতা—ইত্যাদি নিয়ে জল্পনা ও গুজব রটিয়ে, শেষ পর্যন্ত তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছিল: নাহ্, সোভিয়েতেরা সামরিক ঘাঁটিই বানাচ্ছে। বাংলাদেশকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে অপারগ সোভিয়েতরা, উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ, ইত্যাদি কথা তো অহরহ শোনা যাচ্ছিল।
আমি এই সময়ে বন্ধু আর সহকর্মীদের কাছে অনেক চিঠিপত্র পেয়েছিলাম। তাঁরা সকলে আমার ধৈর্য দেখে অবাক হয়েছিলেন, কীভাবে বিভিন্ন সময় জারি হওয়া সময়সীমার ব্যাপার আমি বিনা প্রতিবাদে সায় দিয়ে নাবিকদের সেটা অনুযায়ী তাগাদা দিচ্ছি, এটা শুনে তাঁরা নির্বাক বনেছেন। কেউ কেউ আমাকে উন্মাদ বলেছিলেন, কেউ বা সন্দেহ প্রকাশ করলেন, আমার ইমেজ ও ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মস্কোতে বসে আমাকে এই কাজে দায়িত্ব দিয়েছে কিনা। আধুনিক প্রযুক্তি তো আমরা নিয়ে আসি নি। আবার অনেকে আমার একাগ্রতা ও কর্মনিষ্ঠার কথা জেনে মুক্ত হৃদয়ে সাফল্য কামনা করেছিলেন। এসব চিঠি থেকে আমি জেনেছিলাম, চট্টগ্রাম ঘুরে আসা আরো কিছু বিশেষজ্ঞ তখনো তোতাপাখির মতো প্রযুক্তির অভাবের দোহাই দিয়ে ভবিষ্যৎ-বাণী করেছেন, এভাবে চলতে থাকলে বন্দর পুনর্গঠনে কয়েক বছর লেগে যাবে। এসব চিঠিপত্র ও মতামত পড়ে আমি বিচলিত হইনি বটে, তবে আমার স্ত্রী ছাড়া কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলিনি। তিনি শেষ পর্যন্ত নিজে চট্টগ্রাম এসে আমাকে আশা দেবার চেষ্টা করেছেন।
ভেরা ইভানোন্না আমার ছাত্র অবস্থায়ই আমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৪১ সালে আমি নৌ একাডেমী পাস করার পর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments