সাগর-বুকে মাইন অন্বেষণ
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
বন্দর থেকে বড়ো ধরনের তিনটি জাহাজ নিরাপদে সরানোর পরে পরবর্তী অন্যান্য জাহাজের জন্য একটি স্থায়ী রুট তৈরি হল। তবে তা ছিল ভারতীয় মাইন-অনুসন্ধানকারীদের তৈরি করা রুটের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ। বঙ্গোপসাগরে জোয়ার-ভাঁটার ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে ও সাগরে মাইন স্থাপনের বিন্যাস বিশেষণ করে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম সাগরে চলাফেরার জন্য কোন্ ব্যবস্থা সবচেয়ে নিরাপদ হবে। বর্তমান কার্যকর রুট ২রা মে থেকে স্বল্পতম সময়ে তিন মাইল পর্যন্ত চওড়া করা যাতে যে কোনো জাহাজ বন্দরে নিরাপদে পৌঁছতে পারে। কার্যকর রুটের দৈর্ঘ্য বরাবর বিশেষ সংকেতচিহ্ন (সিগন্যাল) স্থাপন করে রুটের পুব পাশের সকল মাইন একযোগে নিষ্ক্রিয় করার কাজ আরম্ভ করতে হবে।
২রা মে থেকে মাইন খোঁজা শুরু হল। জাহাজঘাটার ঘণ্টাগুলো জোরেশোরে বাজতে লাগল। বন্দর থেকে একটা-একটা করে জাহাজ বেরিয়ে আসছে। অনুসন্ধানকারীদের বহরে রয়েছে চারটি বি.টি. শ্রেণীর মূল নৌযান ও পাঁচটি ছোট বোট (সম্পূর্ণ নতুন এবং অনভিজ্ঞ ক্রুপরিচালিত)।
'বিটি' নৌযানের ধারণক্ষমতা ৪৫০ মেট্রিক টন আর সর্বোচ্চ গতি ১০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। সেগুলো ১০০, ৪৫ ও ৩৭ মিলিমিটার কামান দ্বারা সজ্জিত, এবং প্রতিটি ক্যালিবারের একটি করে কামান প্রতিটি জাহাজে আছে। মাইন-বিধ্বংসী বোমা আছে বিশটি করে প্রত্যেক জাহাজে। আর প্রধান অস্ত্র রয়েছে ট্রেলার। ট্রেলার হলো এমন একটি লম্বা লোহার রড যার আগায় সংকেতদানকারী যন্ত্র লাগানো রয়েছে।
ট্রেলার বোটগুলো নির্বিঘ্নে কাজ করে যেতে পারত যতক্ষণ-না সাগরে ৩নং বিপদসংকেত জানান দেয়। এদের গতি ছিল ৮ নটিক্যাল মাইল। তাদের অস্ত্র ছিল দুটো ৩৭ মিলিমিটার ক্যালিবারের কামান।
'বিটি' নৌযানের প্রত্যেকটি দলে দুটি করে জাহাজ ছিল। বোটগুলো ছিল আলাদা আলাদা।
উদ্ধারাভিযানের প্রধান মাইন-বিশেষজ্ঞ ২য় র্যাঙ্কের ক্যাপ্টেন ই এ খরোশুন মাইনগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান মানচিত্রে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। পাকিস্তানীরা কোথায় কয়টি মাইন রেখেছে কিংবা সেই মাইনে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের ডুবে থাকা খোল কোনখানে আছে তা কেউ জানত না। আমাদের সামনে কেবল এক হাজার বর্গমাইল পরিমাণ এলাকা জুড়ে বঙ্গোপসাগর রয়েছে আর তার গোটা ক্ষেত্রফল কয়েকটি বড়ো বড়ো সেক্টরে ভাগ করা আছে, সেগুলোর প্রত্যেকটিতে অনুসন্ধান চালাতে হবে। ই.এ. খরোশুন্ ছিলেন মাইন-অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ এবং নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মেধা তিনি আমাদের পরিচালনা নির্মাণে প্রয়োগ করেছেন। এই কাজে অংশগ্রহণকারী অন্য নাবিকেরাও এ ব্যাপারে কম অভিজ্ঞ ছিলেন না।
সাগরের বুকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করা যায়। গাঙচিল সদৃশ দ্রুতগতির বোটগুলো তরঙ্গের উপর দিয়ে দৌড়ে চলেছে, দু-পাশে বিশাল সাদা ফেনা রেখে বন্দরে প্রবেশ করছে বিশালবপু প্যাসেঞ্জার জাহাজ। সারিবদ্ধ সৈনিকের মতো খুঁজে চলেছে কঠোর পরিশ্রমী ট্রেলার নৌযান। প্রতিদিন এই কঠিন পরিশ্রম তারা কেবল দিনের বেলাতেই করত, কারণ রাতের আঁধারে সফল অনুসন্ধান সত্ত্বেও মাইনের অস্তিত্ব সহজে বোঝা যেত না।
বলা হয়ে থাকে যে, মাইনারের (অর্থাৎ মাইন নিয়ে সব ধরনের কাজ যিনি করেন) জীবনে ভুল একবারই ঘটে। অনুসন্ধানের প্রথম দিন আমাদের জন্যে কী বয়ে আনবে? যে-কোনো সামরিক অধিনায়ক তাঁর নিজস্ব ইউনিট বা বাহনকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। যেভাবে বৈমানিকরা তাঁদের প্রথম বিমানকে সুপয়া মনে করেন ঠিক তেমনই মাইনারা তাঁদের প্রথম নিষ্ক্রিয় করা মাইনকে পয়মন্ত মনে করেন। মাইন অনুসন্ধানের কাজ করতে করতে নাবিকেরা তীরবর্তী প্রজেক্টর বাতির পোস্ট দেখে তীর থেকে তাদের নিজের দূরত্ব বুঝতে পারে। বাতিওয়ালারা দিনে বারো থেকে চোদ্দো ঘণ্টা কাজ করত। অনুসন্ধানকারী দল কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন কয়েক বার করে পোস্টগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত, ১ম-২য়-৩য় পোস্টের খোঁজখবর নিত। কুতুবদিয়ায় অবস্থিত পোস্ট থেকে দ্রুত জবাব আসে: আমি অমুক পোস্ট, প্রচণ্ড গরম, চারদিকে সাপ কিলবিল করছে, খাবার পানি নেই, পানি যেটুকু রয়েছে তা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments