উপক্রমণিকা
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
কবিতায় আসে বাংলাদেশের গান
রংয়ের বাহার শিশিরের কণা যত
ভাবি না কখনো জাগিবে কবিতাখান
যেন বন্দর খোলে নাবিকের কথামতো।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দিনটিতে, ২৬শে মার্চ ১৯৭১, এই দেশের সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ যোগাযোগের ভাবনা না ভেবেই দীর্ঘ পথযাত্রার প্রস্তুতি আমি নিচ্ছিলাম। ঝড়ে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের দায়িত্বে নিয়োজিত উত্তরাঞ্চলীয় নৌবহরে ২৭শে মার্চ সকালে আমার যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাত্রাপথেও এবং শ্বেত সাগরে কঠিন দায়িত্ব পালনের সময়েও আরো অনেক সোভিয়েত মানুষের মতোই আমি চিন্তাক্লিষ্ট মনযোগ নিয়ে সুদূর দক্ষিণপূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশের ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছিলাম। সংবাদপত্রে সেখানকার হৃদয়বিদারক কাহিনী আমরা তখন যথেষ্ট সহানুভূতির সঙ্গে অনুসরণ করেছি। দিনা নদীর বুকে দুর্ঘটনাস্থলে যাত্রা করার সময়ে আমাকে আন্তর্জাতিক কোনো বিষয়ে এক রাজনৈতিক ভাষণ দিতে অনুরোধ জানানো হয়; তখন আমি নাবিকদলকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ঘটনাটি জানালাম, সেটি রেডিও ও সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়েছিল। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা হয়েছিল:
পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা, ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত কররার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
সর্বশক্তিমান আলাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ, দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবাদ পৌছে দিন। আলাহ্ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।
শেখ মুজিবুর রহমান
২৬ মার্চ ১৯৭১
মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেখিয়ে আমি এই ঘোষণাসহ অন্যান্য ঘটনা শ্রোতাদের কাছে বর্ণনা করেছিলাম।
১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগের পরে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান। সে সময়ে পাকিস্তানের একটি অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে পূর্ব পাকিস্তানের স্থলে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম ঘোষিত হয়েছিল।
ভারতের সহায়তায় স্বাধীনতা বাংলাদেশের জনগণের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষ হয়েছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান রক্তাক্ত সংঘাত দেশের সমস্ত নৌপরিবহণ যেমন ধ্বংস করেছিল তেমনই গ্রামীণ অর্থনীতিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দেশের অন্যতম প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম। বন্দরের জলসীমায় যুদ্ধকালে ৪০টিরও বেশি স্টিমার ও অন্যান্য নৌযান ডুবে গিয়েছিল। বন্দরের প্রবেশপথ ডুবে-যাওয়া জাহাজে অবরুদ্ধ ছিল। আর বন্দরের আশেপাশে বঙ্গোপসাগর-তলদেশ মাইনভর্তি ছিল। এ সমস্ত কারণে জলপথে ওষুধ, খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা অসম্ভব ছিল। নবজাত প্রজাতন্ত্রে শোনা গিয়েছিল দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি।
৯ মাস ব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রামে পূর্ববঙ্গের মানুষ অসম্ভব ত্যাগস্বীকার করেছিল। তবে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতিগত সমর্থন না পাওয়া গেলে এই যুদ্ধ আরো দীর্ঘমেয়াদী ও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়াত।
২রা এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানের নিকটে মৌখিক আপত্তি জানিয়েছিল এই বলে যে "সোভিয়েত জনগণ বাংলাদেশের জনগণের এরূপ ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার দেখে বিচলিত না হয়ে পারছে না।” ঐ বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল "উদ্ভূত সমস্যার শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানই সোভিয়েত জনগণের একান্ত কাম্য।"
পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা আমাকে বলেছিলেন যে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের এই ঘোষণা শুনে তাঁরা উৎসাহ বোধ করেছিলেন। সোভিয়েত দেশের নৈতিক ও কূটনৈতিক ধারাবাহিক সমর্থন তাঁদের শক্তি যুগিয়েছিল ও বিজয়ের আত্মবিশ্বাস জোরালো করেছিল। মুক্তিসংগ্রামের সমস্ত জটিলতা ও পর্বতসদৃশ বাধা সত্ত্বেও তা সমাপ্ত হয়েছিল বিজয়ে।
আমরা সোভিয়েত জনগণ ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক শক্তির
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments