লাল পল্টন

ফুলবানুকে ও দেখে, প্রাণভরে দেখে। কেমন একটা ফুলের মতন মেয়ে। বুকে চেপে ধরলে মনে হয় ফুলবানু বুঝি বুকের ভেতরটায় ঢুকে পড়বে। ফুলবানুও কেমন যেন সুযোগ বুঝে শরীরটাকে একেবারে ছেড়ে দেয়, এলোমেলো হয়ে যায়। কদম আলী দু’চোখ বন্ধ করলে সব দেখতে পায়। ফুলবানু চোখ বন্ধ করে থাকে, ভালবাসা ওকে এতটুকু করে দেয়, আরো নরম আরো পেলব করে দেয়। কোথা দিয়ে যে কী হয়, ফুলবানু বুঝতে পারে না। কদম আলী অনুভব করে। ফুলবানু প্রেমের সুখে কথা কয় না। মুখ তোলে না। বুকের ভেতর মাথাটা ঢুকিয়ে একেবারে নিশ্চুপ থাকে। একদিন ও বলে, ফুলবানু, গরীবের ঘরে তোকে মানায় না, বুঝলি, একেবারে মানায় না।

ফুলবানু ওর মুখে হাত চাপা দেয়। বলে, ওসব বলতে নেই।

কদম আলী মাঝে মাঝে ভাবে, মেয়ে মানুষ জাতটাই কি এমনি হয়, না কি ফুলবানুই শুধু আলাদা।

কদম আলী সত্যি সত্যি বুঝতে পারে না ফুলবানুর ব্যবহার। কিছু চায় না মেয়েটা। বাড়িতে যে একটা মেয়ে আছে তা বোঝবার মতো উপায় থাকে না। চুপচাপ, নির্ঝঞ্ঝাট। কারো বাড়ি যায় না। যেন আপনাতে আপনি পরিপূর্ণ। একদিন শুধু বলেছিল—তুমি আছ, আর আমার কিছু চাওয়ার নেই।

কদম আলী বলত—তাই বুঝি, আমি থাকলে তোমার আর কিছু চাওয়ার নেই।

‘না গো না’ বলে ওর বুকে মুখ গুঁজতে থাকে, যেন একেবারে ভেতরে সেঁধিয়ে যাবে।

একদিন কদম আলী দেরী করে ফিরেছিল। কারখানায় গিয়েই দেখে মিছিল চলেছে ঢাকার দিকে। ইউনিয়নের সেক্রেটারী আশরাফ ভাই দেখেই হো হো করে হেসে বলল, নতুন বৌ কিনা, তাই। কদম আলী লজ্জা পেল দেরী করে আসবার জন্যে। ওর বন্ধুরাও টিপ্পনী কাটতে ছাড়ল না। কেউ বলে, শুধু কি নতুন বৌ, তায় আবার সুন্দরী। কেউ বলল—নতুন নতুন ওরকম হয়েই থাকে। লজ্জা করো না কদম ভাই। কদম বুঝতে পারে ওর বৌ-ভাগ্যে সবার হিংসে হচ্ছে। ওর চোখেমুখে লজ্জার ভাব থাকলেও মনে মনে ও খুশিই হ’ল।

মিছিল ততক্ষণে এগিয়ে চলেছে। বিরাট একটা সর্পিল মিছিল। এঁকে বেঁকে চলেছে। এ-মাথা থেকে মিছিলের ও মাথাটা চোখে পড়ে না। মাঝপথে এসে দেখে আর একটা মিছিল চলেছে। সবার হাতে নৌকোর বৈঠা। মাঝিরা মিছিল করেছে এই প্রথম। দুই মিছিল এক হ’ল। ঘন ঘন শ্লোগান উঠল। মাথার ওপর সূর্যের তখন দারুণ উত্তাপ। শরীরের ভেতর রক্ত টগবগ করছে। কদম আলী নিজের অজান্তেই চীৎকার করে উঠল—কৃষক-শ্রমিক অস্ত্র ধর—মিছিলের জনতা গর্জন তুলে উত্তর দিল—বাংলাদেশকে মুক্ত কর। মিছিল এগোয় আর কদম আলীও উত্তেজিত হতে থাকে। তার অজান্তেই সে মাঝে মাঝে বক্তৃতা দিতে থাকে। ভাইসব, আদমজী, দাউদ, ইস্পাহানী আমাদের শত্রু। পাকিস্তানের বাইশ পরিবার সোনার বাংলাকে শ্মশান করেছে। তাই প্রতিশোধ নিতে হবে। কদম আলী পরক্ষণেই ভাবে, সে তো কোনদিন বক্তৃতা দেয় নি। তবে আজ সে ভাষা পেল কোথায়? এমনি ভাবতে ভাবতে সে চলেছে। মিছিলও এগোচ্ছে ঢিমে তেতালায়। কত দিক থেকে কত—যে মিছিল এল তার হিসেব নেই। কারো ঘাড়ে লাঙল, কাঁধে কোদাল কারো হাতে বৈঠা কারো হাতে শুধু লাঠি। এতবড় মিছিল সে দেখেছে নাকি কখনো? এমন সময়ে তার কাঁধে কে যেন হাত রাখল পেছন থেকে। ফিরে দেখে আশরাফ ভাই।

সাবাস, কদম আলী, সাবাস ভাই। মরদের মতো কাজ করছ। আরো জোরে আওয়াজ তোল।

খোদ ইউনিয়নের সেক্রেটারী তার প্রসংসা করছে। আর চাই কি—সে সমস্ত শক্তি দিয়ে শ্লোগান তুলল, কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর—জনতার জবাব—বাংলাদেশকে মুক্ত কর।

তারপর কখন মিছিল এসে পৌঁছেছে রেসকোর্স ময়দানে বুঝতে পারে নি কদম আলী। শুধু শোনা যাচ্ছে শ্লোগান। আর তখন মিছিলের পর মিছিল আসছে। চারিদিকে শুধু মানুষের

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion