-
(১) কোন বেদনায় নিলাম বিদায়
কোন বেদনায় নিলাম বিদায় ‘দিলজানী’ আর দিল জানে
বদ-নসিবের দানাদানি টানছে সে কোন দূর টানে॥
তোমার সিঁথির মতির মতন নজর দেবো অশ্রু বুঁদ।
সেই দূতীরে, সালাম তোমার পৌঁছাবে যে মোর পানে॥
এসো প্রিয়া, আশিস মাগি, আমার সাথে হাত ওঠাও,
তোমার প্রাণে বিশ্বাস আসে, আসেন খোদা মোর ত্রাণে॥
মোদের পরে জুলুম যদি করেই জাগে ঈর্ষাতুর,
ভয় কী সখী, মোদের খোদা শোধ নেবে তার সেইখানে॥
তোমার শিরের কসম শিরিঁ তোমার নেশা টুটবে না,
যদিই ‘তামাম জাহান’ জুটে শির পরে মোর তির হানে॥
জান কি সই, কেনই আমায় ফেরায় গ্রহ দিগ্বিদিক?
তোমার পানে মন টানে মোর, ঈর্ষা জাগে
-
অনাদিকাল জ্বলে থাকা অরূন্ধুতির আলো
নিভে যায় অনুল্লেখ আঁধারী আলোর টানে।
অতিকায় অভিমানের ভারে ভারাক্রান্ত মানুষটিকেও
পেরোতে হয় এক অনতিক্রম্য পথ।
মানুষ জানে, মানুষের হৃদয়ে মানুষের নিঃস্বার্থ ঠাঁই নেই।
মিথোজীবি মন কখনো কখনো পরাশ্রয়মুক্ত জীবনের খোঁজে
হাঁতড়ে বেড়ায় আলোকিত আঁধার।
তবুও চাতক অপেক্ষায় অনুনমিত সহসাই
এবেলা-ওবেলার মত ফুরিয়ে যায় যাপিত জীবন।
-
আমার মনের প্রান্তে তুমি হবে পল্লবপ্রচ্ছন্নশাখাশস্যের মঞ্জরী, আমার প্রাণের বৃত্তে করবীলাঞ্ছনআনত পুষ্পের ভার নিয়ে এসো তুমি। সোনাবালু ঢাকাএ প্রাণ ব্যর্থ হবে তা না হলে, তা না হলে অগণনপাপড়ি খুলে খুলে আকাশ ছড়িয়ে দিলেআশ্বিনের নীলকান্তচ্ছটা, তোমার আমার মাঝে সেতুবন্ধগানের রচনা হবে না; বিশ্বাস দেবে না কেউ জীবনে নিখিলে।তুমি দাও সৃষ্টির প্রেরণা, দাও মৃত্যু, অকরুণ অসহ্য দ্বন্দ্ব!
তুমি হবে শস্যের মঞ্জরী, আনত পুষ্পের ভারকরবীলাঞ্ছন। আমি তাই প্রতিদিন কৃষকের মতোএ প্রাণ করেছি ছিন্ন হালের আঘাতে। করেছি তো অঙ্গীকারচৈত্রের চণ্ডাল সূর্য, বন্যার হাহাকার। তুমি আছো রতআমার রক্তের স্রোতে শিকড়ের জিহবা মেলে দিয়ে রাত্রিদিনঅশ্রান্ত শোষণে, আমার মৃত্যুতে উদ্ভিন্ন মঞ্জরী তোমার হবে মৃত্যুহীন।
মৃগাঙ্ক রায়
পরিচয়
-
আবার বজ্র ঝলসে উঠছে সিনাই উপত্যাকায় রং লেগেছে আবার বাস্তবের মুখশ্রীতেএসেছে বিলয়ের বার্তা, সত্য দর্শনের আমন্ত্রণ
হে দেখার দৃষ্টি এখন সময়, বলো, সাক্ষী থাকার সাহস আছে কি নেই এখন প্রাণের শত্রু দুঃখ নিদানের সহায় ইরমের স্বর্গোদ্যান এখন অনস্তিত্তের মরুর প্রতিচ্ছবিও পাগলামির ভাবনা! না থাকার পথ বেয়ে চলবার সাহস আছে কি নেই!
হে দেখার দৃষ্টি আবার হৃদয়কে সাফ করো, হয়তো এই ফলকে তোমার আমার মাঝে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি উঠবে ফুটে এখন অত্যাচারের প্রথা পৃথিবীতে অভিজাতদের হাতিয়ার তাকে বৈধ করতে ধর্মগুরুরা হয়েছে দক্ষ এখন বহু যুগের বাধ্যতার প্রথায় আনতে বদল অস্বীকারের ফরমান নেমে আসা হয়ে গেছে অনিবার্য
আর শোনো হয়তো এই নির্মল
-
রৌদ্র-ঝিলমিল
উষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল,
অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে-বারে
নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে।
উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী,
উগ্র চুল্লীবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি’,
আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা,
মরীচিকা-ঢাকা।
অগণন যাত্রিকের প্রাণ
খুঁজে মরে অনিবার, পায়নাকো পথের সন্ধান;
চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল;
হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধি-বিধানের এই কারাতল
তোমার ও-মায়াদণ্ডে ভেঙেছো মায়াবী!
জনতার কোলাহলে একা ব’সে ভাবি
কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি
বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী;
স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা
মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা!
চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধা ধরণীর রুধিরলিপিকা,
জ্ব’লে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা!
বসুধার অশ্রুপাংশু আতপ্ত সৈকত,
ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল,
-
বেলা ব’য়ে যায়,
গোধূলির মেঘ-সীমানায়
ধূম্রমৌন সাঁঝে
নিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে,
শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে;
পান্থ ম্লান চিতার কবলে
একে-একে ডুবে যায় দেশ জাতি সংসার সমাজ;
কার লাগি, হে সমাধি, তুমি একা ব’সে আছো আজ—
কি এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!
অতীতের শোভাযাত্রা কোথায় কখন
চকিতে মিলায়ে গেছে পাও নাই টের;
কোন্ দিবা অবসানে গৌরবের লক্ষ মুসাফের
দেউটি নিভায়ে গেছে—চ’লে গেছে দেউল ত্যজিয়া,
চ’লে গেছে প্রিয়তম—চ’লে গেছে প্রিয়া
যুগান্তের মণিময় গেহবাস ছাড়ি
চকিতে চলিয়া গেছে বাসনা-পসারী
কবে কোন বেলাশেষে হায়
দূর অস্তশেখরের গায়।
তোমারে যায়নি তা’রা শেষ অভিনন্দনের অর্ঘ্য সমর্পিয়া;
সাঁঝের নীহারনীল সমুদ্র মথিয়া
মরমে পশেনি তব তাহাদের বিদায়ের
-
সেদিন এ-ধরণীর
সবুজ দ্বীপের ছায়া—উতরোল তরঙ্গের ভিড়
মোর চোখে জেগে-জেগে ধীরে-ধীরে হ’লো অপহত
কুয়াশায় ঝ’রে পড়া আতসের মতো।
দিকে-দিকে ডুবে গেল কোলাহল,
সহসা উজানজলে ভাটা গেল ভাসি,
অতিদূর আকাশের মুখখানা আসি
বুকে মোর তুলে গেল যেন হাহাকার।
সেইদিন মোর অভিসার
মৃত্তিকার শূন্য পেয়ালার ব্যথা একাকারে ভেঙে
বকের পাখার মতো শাদা লঘু মেঘে
ভেসেছিলো আতুর উদাসী;
বনের ছায়ার নিচে ভাসে কার ভিজে চোখ
কাঁদে কার বাঁরোয়ার বাঁশি
সেদিন শুনিনি তাহা;
ক্ষুধাতুর দুটি আঁখি তুলে
অতিদূর তারকার কামনায় আঁখি মোর দিয়েছিনু খুলে।
আমার এ শিরা-উপশিরা
চকিতে ছিঁড়িয়া গেল ধরণীর নাড়ীর বন্ধন,
শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন—
মোর তরে পিছু ডাক মাটি-মা—তোমার;
-
আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল
কুয়াশার; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায়
তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল
জোনাকিতে ভ’রে গেছে; যে-মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ–কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;
আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো,
খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার:
পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ, মাঠে-মাঠে ডানা ভাসাবার
গভীর আহ্লাদে ভরা; অশথের ডালে-ডালে ডাকিয়াছে বক;
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এই সব নিভৃত কুহক;
আমরা দেখেছি যারা বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাত
এড়ায়ে
-
আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে হয়।
সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর? শরীরের স্বাদ
কে বুঝিতে চায় আর? প্রাণের আহ্লাদ
সকল লোকের মতো কে পাবে আবার।
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই, ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
-
তুমি তা জানো না কিছু—না জানিলে,
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;
যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে’—
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষ’য়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই;
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে;
আমি ঝ’রে যাবো–তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ’রে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে,
—আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।
রয়েছি সবুজ মাঠে—ঘাসে—
আকাশ ছডায়ে আছে নীল হ’য়ে আকাশে-আকাশে;
জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়
এই সব
-
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান,
দেহের স্বাদের কথা কয়;
বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট ক’রে দেবে তার সাধের সময়
চারিদিকে এখন সকাল—
রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল;
মাঠের ঘাসের ’পরে শৈশবের ঘ্রাণ—
পাড়াগাঁর পথে ক্ষান্ত উৎসবের এসেছে আহ্বান।
চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা-ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল;
প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসে
পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাঁড়ারের দেশে!
শরীর এলায়ে আসে এইখানে ফলন্ত ধানের মতো ক’রে,
যেই রোদ
-
যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’লাে আজ রাত্রেতার মুখে খবর পেলুম:সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকারজন্মমাত্র সুতীব্র চীৎকারে।খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাতউত্তোলিত, উদ্ভাসিতকী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।সে ভাষা বােঝে না কেউকেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষাপেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগেরপরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুরঅস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান:জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ-পিঠেচ’লে যেতে হবে আমাদের।চ’লে যাবে—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণপ্রাণপণে পৃথিবীর সরাবাে জঞ্জাল,এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবাে আমিনবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।অবশেষে সব কাজ সেরেআমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকেক’রে যাবাে আশীর্বাদ,তারপর হব ইতিহাস॥
ছাড়পত্র
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- আবুল হাসনাত (১)
- কাইফি আজমি (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (৫)
- জীবনানন্দ দাস (১০)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নিবারণ পণ্ডিত (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১)
- বিষ্ণু দে (১)
- মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- মলয় রায়চৌধুরী (১)
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- মেহেরুন নেসা (১)
- যতীন সরকার (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (২)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (১)
- শামসুর রাহমান (১)
- সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- সুকান্ত ভট্টাচার্য (৯)
- সুনির্মল বসু (৩)
- হরবোলা (১০)
- হাফেজ শিরাজি (১)
- হাসান মুরশিদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.