-
লেখক: অধ্যাপক অজয় রায়
আমাদের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই তিনি চলে গেলেন। ১৯৩৩ সালে ১ অক্টোবরে ঢাকা শহরের বকশীবাজার এলাকায় নবকুমার ইনস্টিটিউটের পাশে মাতামহ পূর্ণানন্দ গুপ্তের বাড়িতে প্রিয়দর্শনের জন্ম হয়। তার শিক্ষা প্রধানত ঢাকা শহরে পগোজ হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ এবং সর্বশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি (১৯৫৪) নিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তবে অবশ্য মাঝখানে কলকাতায় এসে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে দু'বছরের বিএসসি (Hons) ডিগ্রি নিয়ে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন।
তিনি কলকাতায় ১৯৫৪ সালে বঙ্গবাসী কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে ওই কলেজ থেকে অধ্যাপকরূপে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মান ও ভালোবাসা
-
লেখক: অজয় দাশগুপ্ত
১৯৭১ সালের পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অধিকৃত বাংলাদেশ ভুখণ্ডে মুক্তিবাহিনী ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। তারা দেশের সর্বত্র গুলি-বোমায় নাস্তানাবুদ করছিল খানসেনাদের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও দিল্লি সফরকালে সেটা ভালোভাবেই অবহিত হতে পেরেছেন। স্বদেশে ফিরে তিনি নিজেও বোমা ফাটালেন, যা কাঁপিয়ে দিল হোয়াইট হাউসকে। রিচার্ড নিক্সন ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের বর্বর গণহত্যা শুরুর পর থেকেই দাবি করে আসছিলেন—পাকিস্তানের সৈন্যরা তাদের দেওয়া অস্ত্র ব্যবহার করছে না। তারা পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু এডওয়ার্ড কেনেডি কংগ্রেসের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাকিস্তানে ২০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের
-
যদিচ জগতের রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, জাতীয়তার ভিত্তি প্রধানত ভাষা ও প্রাকৃতিক তথা ভৌগোলিক অখণ্ডতা; এবং ধর্মের ভিত্তিতে সারা য়োরোপে অথবা আফগানিস্থান থেকে মরোক্কো পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়নি, তথাপি দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তারা দাবি করেছিলেন যে, জাতীয়তার প্রধান শর্ত ধর্ম এবং ধর্মের ভিন্নতা জাতীয়তার পার্থক্য ঘটাতে বাধ্য। এই দাবির ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিলো এবং জন্ম হয়েছিলো পাকিস্তান নামক একটি কিম্ভূত রাষ্ট্রের। কিম্ভূত, কেননা, দেড় হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দেশের দুটি অংশ এবং এই দুই অংশের জনগণের ভাষা আলাদা, আলাদা পোশাক-পরিচ্ছদ, শিক্ষা-দীক্ষা, রুচি-রুজি, খাদ্যপানীয়—সংক্ষেপে সংস্কৃতি। ধর্মের ঐক্য ব্যতীত পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের কার্যত কোনো মিল নেই। কিন্তু ইংরেজ রাজত্বকালে ঐতিহাসিক
-
১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল। আজ ১৯৭১ সালে তাঁদের সকলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। বুদ্ধিজীবীদের মানসচৈতন্যের এই পরিবর্তন বিস্ময়কর হলেও অস্বাভাবিক নয়। দেশবিভাগের পূর্বে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রবল প্রতিবাদ ছিল অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে। এই অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষমতা ছিল যাদের, তারা সেই ক্ষমতার প্রয়োগে শিক্ষা ও রাজনীতি ক্ষেত্রে আপন প্রতিষ্ঠাকে সম্ভবপর করেছিল। তাই অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নির্মাণ করেছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য। তখন অর্থনৈতিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বাংলাদেশের হিন্দু ভূস্বামীবৃন্দ এবং এই ক্ষমতার বলে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন অগ্রসর এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভের অধিকারী।
-
বাংলাদেশে সর্বহারা পার্টি আর পশ্চিম বাংলার নকশালপন্থী। শাসকগোষ্ঠী এবং জোতদার ও বিত্তশালীদের দৃষ্টিতে ‘ভয়াল’ ও ‘ভয়ংকর’। এবারের প্রতিবেদন হোচ্ছে ১৯৮৯ সালে পশ্চিম বাংলার নকশালপন্থীদের হাল-হকিকত সম্পর্কিত। অনেকের মতে, ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত মোট তেরো বছরের নকশাল আন্দোলন এখন বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের অধ্যায় মাত্র। কিন্তু বাস্তবে কি তাই?
তা'হলে তো গোড়া থেকেই সংক্ষিপ্ত আকারে কথাগুলো বোলতে হোচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের ওধারে শিলিগুড়ি। আর এই শিলিগুড়ির অদূরে ৩টি থানা যথাক্রমে ‘ফাঁসি দেওয়া’, ‘খড়িবাড়ি’ এবং ‘নকশালবাড়ি’। আজ থেকে ২২ বছর আগে এই এলাকার শোষিত ক্ষেতমজুর এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের নেতৃত্বে ঘোষিত হোয়েছিলো এক ‘রক্তাক্ত সশস্ত্র বিপ্লব’। নেতার নাম কমরেড চারু মজুমদার।
-
লেখক: গৌরী আইয়ুব দত্ত
বাংলা দেশ নিয়ে এই যাতামাতি, মুজিবর রহমানকে নিয়ে এই উচ্ছ্বাস পশ্চিম বাংলার অনেক মুসলমান পছন্দ করছেন না। এই নিয়ে বহু প্রশ্ন, কিছু বিদ্রুপ কিছু বা হতাশা মিশ্রিত মন্তব্য শুনতে পাই। কিন্তু হিন্দু সমাজের পক্ষে এটা বোঝা কি খুব কঠিন যে পাকিস্তান ধসে পড়ার অর্থ ভারতীয় হিন্দু-মুসলমান উভয়ের কাছে এক হতে পারে না? এই উপমহাদেশে রাজাগোপালাচারী কিংবা জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো গুটি দুই চার মানুষ ছাড়া আর প্রায় কোনো হিন্দুই পাকিস্তানকে মনে মনে মেনে নেননি। ফলে আজ যথন পাকিস্তানের বুনিয়াদ উলে উঠেছে তখন মুখ্যত সেই কারণেই হিন্দুরা খুশি এ কথা গোপন করে লাভ নেই। তবু বাঙলা দেশের একটা
-
বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র নয় মাস। নয় মাসের এই যুদ্ধে বাঙালি জাতিকে চরমতম ত্যাগ, দুঃখ, দুর্দশা ও নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। এই নয় মাসে বাংলাদেশে যে গণহত্যাযজ্ঞ ও নারী নির্যাতন হয়েছে স্মরণকালের ইতিহাসে তার নজির নেই। এর পাশাপাশি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকেও স্বীকার করতে হয়েছে চরম পরাজয়। পর্যাপ্ত রসদ ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৯২ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব বিজয়, বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের, জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছে বাঙালি।
'৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাস স্থায়ী এই মুক্তিযুদ্ধে এত দ্রুত
-
॥ ১॥
যে-প্রবল প্রাণশক্তি সৃজনশীলতার সকল দুয়ার খুলে দেয়, জীবন-যাপনের ব্যর্থ আবর্জনা সরিয়ে সুন্দরের কল্যাণের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, অশিক্ষা এবং দেউলে রাজনীতিকে অতিক্রমণ করার প্রেরণা যোগায়, আমাদের বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) মানুষদের দুর্ভাগ্য, সে-প্রবল প্রাণশক্তি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল, কখনো মূর্চ্ছাতুর ছিল, কখনো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে বিকারগ্রস্ত ছিল। সুন্দরভাবে বাঁচার প্রশ্নই ওঠে না, মামুলীভাবে বাঁচাটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষিত ছিল। স্বাধীনতা, মানুষের সকল রকম বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি—আমাদের কাছে সকল রকম বন্ধনের অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত। ইখতিয়ারুদ্দীন বখতিয়ার থেকে নবাব সিরাজউদ্দোলাহ্ যে-ভাষায় আঘাত দিতে চেষ্টা করেন নি, দুশো বছরের ইংরেজ শাসনে যে-ভাষা আক্রান্ত হয় নি—স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পরের বছরই সে-ভাষা প্রবলভাবে আক্রান্ত হ’ল। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আমরা একদা
-
পূর্ব বাংলার বাঙালিত্বকে মুছে ফেলার প্রয়াস ছিলো পাকিস্তানি নেতাদের। তাঁরা আশা করেছিলেন পূর্ব দিগন্তে বাস করেও বাঙালিরা স্বপ্নে বিচরণ করবেন আরব-ইরানে। দোয়েল-কোয়েল ডাকা তাল-তমাল-জারুল-হিজল বনে বেষ্টিত থাকলেও সে দেশের কবিরা কবিতা লিখবেন খেজুর-বাবলা আর বলবুলি নিয়ে। কিন্তু স্বভাব স্বীকরণ করে না এমন অসম্ভব এবং উদ্ভট পরিকল্পনাকে। সংস্কৃতি কি কলকারখানার ছাচে ঢেলে তৈরি করা যায়? সে থাকে মনোলোকের গভারে। ভাষার মতো সব অত্যাচারকে অগ্রাহ্য করে সে প্রকাশ করে আপন স্বরূপকে। পূর্ব বাংলার সংস্কৃতির ওপর সরকারি জলুম এসেছে নানাপথে। রবীন্দ্রনাথের ওপর উদ্ধত আক্রমণ তার অন্যতম। রবীন্দ্রনাথের পরাজয় এবং বিলোপ যেহেতু বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরাজয় এবং বিলোগের নামান্তর তাই তিনি হিন্দু বলে,
-
“কোনো ধর্মই উদার ও অসাম্প্রদায়িক হতে এবং হৃদয় ও বোধের মহত্ত্বলাভে বাধা দেয় না। হজরত নিজামুদ্দিন আওলিয়া, মইনউদ্দিন চিশতী, শাহ জালাল, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ প্রভৃতি সাধককুলমণিগণ ধর্মভীরু ধার্মিক ছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু এঁদের সাম্প্রদায়িক ও ভেদবৃদ্ধির ঘৃণ্য ব্যাধি স্পর্শ করতে সাহস করেনি। অন্য দিকে হাজী মহসীন, স্যার সৈয়দ আহমদ, মৌলানা আজাদ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায় প্রভৃতি ধার্মিকগণ প্রগতির মশালবাহক ছিলেন। ধর্মই মানুষকে তাঁর আদিম যুগ থেকে পথ দেখিয়ে আজ অ্যাটমিক যুগে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। যা ন্যায় ও সত্য তাই ধর্ম এবং যা অন্যায় ও মিথ্যা তাই অধর্ম।”—৭ জুলাই-এরআনন্দবাজারপত্রিকায় প্রকাশিত জনাব ওবায়েদুল হক
-
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন অঙ্গাঙ্গী জড়িত। দেখা গেছে রাজনৈতিক কিছু মুনাফা আদায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আবার শেষোক্ত আলোড়ন উপরি উপরি যাই হোক, তার দীর্ঘ মেয়াদী উদ্দেশ্য কিন্তু রাজনৈতিক। বাংলাদেশে এখনকার প্রবণতার হেতু সন্ধানের জন্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক পটভূমি-সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।
অনেকে তো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন নিজের নাড়িতেই অনুভব করেছেন।
তাঁদের জন্যে বেশী কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু অনেকের জ্ঞান কেবল ইতিহাস মারফৎ। তাই অতীতের কবর আবার নতুন করে খুঁড়ে দেখতে হয়।
পাকিস্তান গঠিত হয় দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর। মুসলমানরা এক জাতি, যেহেতু তাদের ধর্ম এক। মোদ্দা কথা এইখানে এসে দাঁড়ায়। ধর্মকেই জাতীয়তা গঠনের একমাত্র উপাদান-রূপে তখন মুসলিম লীগ প্রচার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
উৎস
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.