হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসন (১৮০৫–১৮৭৫)
ডেনমার্কের ওডেন্স শহরে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যাণ্ডারসনের জন্ম। গরিব মুচির ছেলে। ছোটোবেলা থেকে ভারি কল্পণাপ্রবণ। ১৮১৬ সালে বাপের মৃত্যুর পর থেকে আর কেউ ছেলেটার দেখাশুনো করত না। সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে, বাড়িতে বসে খেলনার থিয়েটার বানাত, পুতুল বানাত, তাদের জন্য নানারকম পোশাক বানাত। আর কেবলই দেশের বিদেশের যেখানকার যত নাটক পেত, সব পড়ত।
বড়োরা বললেন ওকে দরজির কাজ শেখানো যাক। এদিকে শেষকালে অ্যাণ্ডারসনের ইচ্ছা সে পেশাদার অপেরা গায়ক হবে। পালিয়ে কোপেনহাগেনে গিয়ে কিছুকাল থিয়েটারে থিয়েটারে ঘুরে বড়ো কষ্টে দিন কাটাল। সবাই বলত দূর, দূর, ছেলেটা ক্ষ্যাপা। অবশেষে হ্যান্স কয়েকজন নামকরা সঙ্গীতজ্ঞের সাহায্যও পেয়েছিল। কিন্তু গলাটাই গেল খারাপ হয়ে; তখন সে রয়েল থিয়েটারে নাচ শিখতে লাগল। সেখানকার অধ্যক্ষ ওকে বড়ো স্নেহ করতেন।
কেমন করে রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডারিকের নজরে পড়ে যাওয়াতে, তিনি অ্যাণ্ডারসনকে কয়েক বছর বিনি পয়সায় একটা বড়ো বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেখালেন ৷ তার আগেই মাত্র সতেরো বছর বয়সে অ্যাণ্ডারসনের প্রথম বই ‘পালনাটকের কবরের ভূত' প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮২৭ সাল পর্যন্ত লেখাপড়া চলল, যদিও একটুও ভালো। পড়ার শেষে আবার কোপেনহাগেনে গেলেন; তখন তাঁর বাইশ বছর বয়স।
১৮২৯ সালে একটা ভ্রমণকাহিনী, নাটক ও একটা কবিতার বই প্রকাশ করে দেখতে দেখতে লোকের সুনজরে পড়ে গেলেন। ১৮৩৩ সালে রাজার কাছ থেকে বৃত্তি পেয়ে সমস্ত ইউরোপে ঘুরে বেড়ালেন।
১৮৩৫ সালে কোপেনহাগেনে রূপকথার প্রথম খণ্ড প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেগুলি যে কী অসাধারণ গল্প সে কথা বুঝতে লোকের একটু সময় লেগেছিল।
রূপকথার চেয়ে বড়োদের উপন্যাস প্রবন্ধের জন্য তাঁর বেশি নাম হয়েছিল। মাঝে কিছুদিন তিনি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কতকগুলো অসাধারণ খামখেয়ালী রচনাও এ-সময়ে লিখে খুব আদর ও খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
১৮০৮ আর ১৮৪৫-এ রূপকথার দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। ইউরোপের সব দেশের লোকদের সে কী আগ্রহ! শুধু ডেনমার্কেই যেন ততখানি নয়।
১৮৪৭ সালে ইংল্যাণ্ডে গিয়ে খুব আনন্দে কিছুদিন কাটালেন। সেখানে যথেষ্ট আদরও পেলেন। ফিরে আসবার সময় স্বয়ং চার্লস ডিকেন্স জাহাজ-ঘাটে এসে তাঁকে বিদায় জানিয়েছিলেন।
ভালো ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার বলে খ্যাতিলাভ করবার দিকেই তাঁর ঝোঁক ছিল। রূপকথাগুলো থেকে তেমন কিছু আশা করতেন না। অথচ সেইগুলিই বিশ্ব-সাহিত্যে অকৃত্রিম ও অদ্বিতীয় বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। রূপকথাকে গুরুত্ব না দিলেও তা লিখে যেতেন। ১৮৪৭, ১৮৪৮ সালে ও তার পরেও আরো অনেকগুলি রূপকথা লেখা হয়েছিল।
১৮৭২-এ শেষ রূপকথাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল।
সেই বছরেই পড়ে গিয়ে এত জখম হয়েছিলেন যে আর কখনো আগেকার স্বাস্থ্য ফিরে পান নি। ১৮৭৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
অ্যাণ্ডারসনের রূপকথার বিশেষত্ব হল যে, এগুলি তাঁর নিজের মনগড়া মৌলিক গল্প; গ্রিমভাইদের গল্পের মতো পুরনো গল্পের সংগ্রহ নয়। এগুলির সাহিত্যিক গুণও অনেক বেশি।
সবচাইতে আশ্চর্যের কথা হল যে অ্যাণ্ডারসনের এই-সব গল্প যে কালে, যে দেশের ছেলেমেয়েদের জন্য লেখা হয়েছিল, তখন ঘরে ঘরে বিজলীবাতি জ্বলত না, এরোপ্লেনের কথা ছেড়েই দেওয়া যাক, মোটরগাড়িও তৈরি হয় নি, তখন দেশ ভ্রমণে বেরুত লোকে বড়ো-বড়ো ঘোড়ার গাড়িতে, বেপরোয়া যারা তারা কৌচবাক্সে উঠে বসে, দৃশ্য দেখতে দেখতে যেত। সমস্ত হালচাল তখন আলাদা ছিল, ওদের দেশেই সে-সমস্ত বদলে গেছে আর আমাদের সঙ্গে যে কোনো সাদৃশ্য থাকবে না, সে কথা তো বলাই বাহুল্য। তবু গল্পগুলো পড়ে মন কেমন করে, মনে হয় কত-না আপনজনের কথা হচ্ছে। তাদের সুখে আনন্দ হয়, তাদের দুঃখে কষ্ট হয়। তারা যে ভিন যুগের ভিন দেশের মানুষ, সে কথা একবারও মনে হয় না। তার কারণ বাইরের মানুষদের নিয়ে তো আর এ গল্প নয়, এ গল্প হল অন্তরের কথা নিয়ে,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments