ঢাকার বুকে
আমরা উঠলুম ৩৬ নম্বর কামিনীভূষণ রুদ্র রোডে, যার পোশাকি নাম চাঁদনী ঘাট। ১৯৪৮-এর ঢাকা। ব্রিটিশ আমলের পুরো গন্ধ তো ছিলই, মোগল আমলের ছিটেফোঁটা লালবাগ, আমলিটোলা, চকবাজার, মোগলটুলি, ইসলামপুর-এসব এলাকার অলিগলিতে যেন বা সেকালও উঁকি মারত। আমাদের এই হিসেবে প্রাউডলকের উদ্যান নগরী শ্যামলী রমনা হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এক বিস্ময়। এ কথা বলা যাবে না নবাবি আমলের ঢাকা সম্পর্কে। বিদ্যুতের ব্যবহার তখনো সর্বগামী ছিল না। ফলে সন্ধে নামলেই সেকালের জেলা শহরগুলোর মতোই অন্ধকার নেমে আসত ঢাকার শিরা-উপশিরায়, বাড়ি বাড়ি জ্বলে উঠতো হারিকেন লণ্ঠনের আলো। মাঝে মাঝে খাপছাড়াভাবে কোনো কোনো ভাগ্যবানের বাড়ির জানালা গলিয়ে বিদ্যুতের ঝলমলে নরম আলো এসে পড়ত খোয়াভাঙা রাস্তার ওপর। হয়তো গুটিসুটি শুয়েছিল কোনো নষ্টচেতন কুকুর। ভয় পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে পিটপিট করে তাকাত ওই আলোকচ্ছটার দিকে এবং আশু কোনো আশঙ্কা দেখতে না পেয়ে পৈথানে মুখটি আলতোভাবে রেখে চোখ বুজত আবার। রাত যত গভীর হতো, নাইট শোয়ের যাত্রীদের নামিয়ে ঘরে ফিরত ছ্যাকড়া গাড়িগুলো ছরছর-টগবগ শব্দ তুলে। কোচোয়ানের মুখে হয়তো ফিরছে 'অচ্ছুৎকন্যা'র দেবীকা রানীর গান 'স'বনকে চিড়িয়া বনবন বন্ধুরে' কিংবা কাননের অমর গান 'আমি বন ফুল গো' অথবা 'বসন্ত' কি 'বন্ধন' ছবির চটুল কোনো চরণ। আবার কুমোরটুলি কি সাঁচীবন্দরের হট্টবিলাসিনীদের সঙ্গসুখ ফেরত টুপভুজঙ্গ কেউ টোয়াতে টোয়াতে একবার পড়ছে নর্দমায় তো আরেকবার 'আয় মেরি জান' বলে জড়িয়ে ধরছে ইয়ার-সাঙ্গাতকে কিংবা কোনো নিরীহ পথচারীকে। বওয়াটে পিলইয়ার ছোকরার তাড়ির পেটগোলানো গন্ধে বেচারির বিবমিষার যো-পালাতে পথ পায় না। রিকশাওয়ালা অকারণ ঘণ্টা বাজিয়ে গৃহস্থের শয়নভঞ্জন ঘটিয়ে এবং ওই অতো রাতে 'চিনাবাদাম' বলে শেষ হাঁকটি হেঁকে ঘরে ফিরছে পিচ্চি এক বাদামওয়ালা। পাড়ার যে ভাগ্যিমানের বাড়িতে বেতারযন্ত্র রয়েছে, ভেসে আসছে তারই সুবাদে সেকালের জনপ্রিয় রেডিও সিলোনের কৃপায় শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন মায়াবী রাতে কোকিলকণ্ঠী খুরশিদের তানসেন ছায়াছবির বর্ষার আগমনী গান- 'বরষো বরষো/জোর জোর ঘন ঘোর শোর কর বরষো...।' অদূরে ফাঁড়িতে পেটা ঘণ্টায় যামিনীর দ্বিতীয় প্রহর ঘোষিত হতেই পুরবাসীরা নতুন করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিত। জেগে উঠত আজকের মতো মাইকের অসুর ধ্বনিতে নয়, সাদামাটা মিঠে গলায় আজানের বোলে।
আগেই বলেছি, আমাদের তখন চকবাজারের কাছে উর্দু রোডসংলগ্ন চাঁদনীঘাট রোড তথা কামিনীভূষণ রুদ্র রোডে বাড়ি। চাঁদনীঘাট কেন কামিনীর রুদ্র রোষে পড়ে ঘাট মানল, এখন সেই কথা।
মোগল আমল সেটা। নবাব ইসলাম খাঁ চিশতি তখন সম্রাট জাহাঙ্গীর নিয়োজিত বাংলার প্রথম সুবেদার হিসেবে ঢাকাতে। বুড়িগঙ্গার তীরের এই চাঁদনীঘাটের তখন খুব নামডাক। বর্তমান ওয়াটার ওয়ার্কস রোড এবং বিলুপ্তপ্রায় বশিরুদ্দিন সরদার পার্কটিকে ঘিরে যে মস্ত এলাকা, তার পুরোটা জুড়ে ছিল চাঁদনীঘাট অঞ্চল। এই ঘাটের নামের সঙ্গে চাঁদনী যুক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে নবাব ইসলাম খাঁর এক বজরা।
এ ঘাটে থাকত নবাবের বজরার বহর। বহরে ছিল চাঁদনী নামের এক বিরাট শাহিবজরা। প্রমোদতরী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যদিও ফতেহ দরিয়া নামেও তার আরেকটি প্রমোদতরী ছিল, তথাপি জাঁকজমকের দিক দিয়ে বেশি আড়ম্বরপূর্ণ চাঁদনীর নামেই ঘাটের নাম ছড়িয়ে পড়ে। এই বজরা ও ঘাটের প্রতি নবাবের এতই দুর্বলতা ছিল যে তিনি এই ঘাটের কয়েক মাইলের মধ্যে কোনো নৌকো বা জলযানের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। মতান্তরে এই চাঁদনী বজরাটি ছিল সুবেদার ইসলাম খাঁর পরিবারের আবাসস্থল। এটি যেখানে বাঁধা থাকত বা যেখানে তার প্রথম আগমন ঘটেছিল, সেই স্থানটিই চাঁদনীঘাট নামে পরিচিত হয়ে পড়ে। আজ সেই খাঁ সাহেবও নেই, তাঁর বোলবোলা ও চাঁদনীও নেই। কালের ছোবলে সবকিছুই নিশ্চিহ্ন।
তবে বজরার বহর না থাকলেও যেন বা ঘাটের মর্যাদা রক্ষার জন্য বর্ষাকালে যখন ক্ষীণতোয়া বুড়িগঙ্গা তীরের পাশ দিয়ে কুলকুল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments