রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ-ভাবনা

লেখক: অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানেই এক অপার বিস্ময়, বহুমুখী প্রতিভার সমন্বয়। শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি শাখায়ই তাঁর ছিল দাপুটে বিচরণ। দর্শন, অর্থনীতি, কৃষি, সমাজ, পল্লীজীবন ইত্যাদি নিয়ে তাঁর ছিল মৌলিক ভাবনা। পরিবেশ সচেতনতা তথা পরিবেশ-ভাবনা সাম্প্রতিক কালের বিষয় বলে বিবেচিত হলেও, অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ পরিবেশ নিয়ে ভেবেছেন। পরিবেশকেন্দ্রিক নানা উদ্যোগের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। পরিবেশ-ভাবনা ছিল তাঁর স্বদেশ ভাবনার বড় অংশ জুড়ে। পরিবেশ-ভাবনায় তিনি ছিলেন তাঁর যুগের চেয়ে বিস্ময়করভাবে অনেক অগ্রসর।

রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ-ভাবনা নগরকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হয়নি, অগ্রসর হয়েছে গ্রামবাংলাকে কেন্দ্র করে। ‘বধূ’ কবিতায় তিনি নগরকে তুলে ধরেছেন এভাবে—“ইটের পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট,/ নাইকো ভালবাসা, নাইকো খেলা।” আর গ্রাম সম্পর্কে ‘পল্লীপ্রকৃতি’ রচনায় তিনি বলেছেন—“আমার যে নিরন্তর ভালবাসার দৃষ্টি দিয়ে আমি পল্লী গ্রামকে দেখেছি, তাতেই আমার হৃদয়ের দ্বার খুলে গিয়েছে।”

জমিদারিকে আসমানদারি মনে করতেন বলেই রবীন্দ্রনাথ জমিদারি করতে এসে স্বদেশকে, গ্রামকে চিনেছিলেন। বাংলার পরিবর্তন সম্পর্কে কবি ‘পল্লীপ্রকৃতি’ রচনায় বলেছেন-“আজ গ্রামের আলো নিবল। শহরে কৃত্রিম আলো জ্বলল—সে আলোয় সূর্য চন্দ্র নক্ষত্রের সংগীত নেই। প্রতি সূর্যোদয়ে যে প্রণতি ছিল, সূর্যাস্তে যে আরতির প্রদীপ জ্বলত, সে আজ লুপ্ত, ম্লান। শুধু যে জলাশয়ের জল শুকোলো তা নয়, হৃদয় শুকোলো। জীবনের আনন্দে মাঠের ফুলের মতো যে সব নৃত্যগীত আপনি জেগে উঠত তারা জীর্ণ হয়ে ধুলায় মিলিয়ে গেল। প্রাণের ঔদার্য এত কাল আপনিই আপনার সহজ আনন্দের সুন্দর উপকরণ আপনিই সৃষ্টি করেছে—আজ সে গেল বোবা হয়ে, আজ তাকে কলে-তৈরি আমোদের আশ্রয় নিতে হচ্ছে—যতই নিচ্ছে ততই নিজের সৃষ্টিশক্তি আরো অসাড় হয়ে যাচ্ছে।”

রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ-ভাবনায় প্রাচীন ভারতের ‘তপোবন’-এর বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন ভারতে ‘তপোবন’ ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কবির ভাষায়“সেই অরণ্যবাস নিঃসৃত সভ্যতার ধারা সমস্ত ভারতবর্ষকে অভিষিক্ত করে দিয়েছে এবং আজ পর্যন্ত তার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়নি।” প্রাচীন ভারতের ‘তপোবন’ আর আধুনিক চিন্তার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল কবির পরিবেশ-ভাবনা। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়েই তাঁর পরিবেশ-ভাবনা অগ্রসর হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে’ রূপ নেয়। ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রবীন্দ্রনাথ পল্লীসংস্কার নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছিলেন। কবি শান্তিনিকেতনে চেয়েছিলেন “এখনকার কালের বিদ্যা আর তখনকার কালের প্রকৃতি।” চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনকে ‘ইকোলজিকাল ভূমি’ হিসেবে গড়ে তুলতে। আকাশের অবস্থা, বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রা, বৃষ্টির পরিমাণ লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশের পর্যবেক্ষণ করার নিয়ম চালু করেছিলেন। গাছপালা ও পশুপাখী সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে হতো শিক্ষার্থীদের।

১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের অদূরে সুরুল গ্রামে রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেন ‘পল্লী সংগঠন কেন্দ্র’। তখন একে বলা হতো ‘ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার, শান্তিনিকেতন’। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল কৃষির উন্নতিসাধন, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি রোগ নিবারণ, সমবায় প্রথায় ধর্মগোলা স্থাপন, চিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং সাধারণ গ্রামবাসীর মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ এই প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে রাখেন ‘শ্রীনিকেতন’।

রবীন্দ্রনাথ বৃক্ষকে জীবনের অংশ বলে ভাবতেন। তাঁর মতে—বৃক্ষকে বাদ দিয়ে কোনো জীবনই টিকে থাকতে পারে না। তিনি নাকি ‘প্রথম জন্মেছিলেন বৃক্ষ হয়েই’। ‘জীবনস্মৃতি’তে কবি বলেছেন—“আমার শিশুকালেই বিশ্বপ্রকৃতির সাথে আমার খুব একটি সহজ ও নিবিড় যোগ ছিল। বাড়ির ভিতরে নারকেল গাছগুলো প্রত্যেকে আমার কাছে অত্যন্ত সত্য হয়ে দেখা দিত। সকালে জাগিবার মাত্র সমস্ত পৃথিবী জীবন উল্লাসে আমার মনকে তাহার খেলার সঙ্গীর মতো ডাকিয়া বাহির করিত।”

কবি বৃক্ষকে ‘মৃত্তিকার বীর সন্তান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বৃক্ষকে বলেছেন বাণীর উৎস, সংগীত সুরের উদ্গাতা। তাঁর লেখায় বারে বারে এসেছে বৃক্ষবন্দনা। ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতায় বলেছেন—“অন্ধ ভূমি হতে শুনেছিলাম সূর্যের আহ্বান,/ প্রাণের প্রথম জাগরণে,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice