নকশালদের শেষ সূর্য
বাংলাদেশে সর্বহারা পার্টি আর পশ্চিম বাংলার নকশালপন্থী। শাসকগোষ্ঠী এবং জোতদার ও বিত্তশালীদের দৃষ্টিতে ‘ভয়াল’ ও ‘ভয়ংকর’। এবারের প্রতিবেদন হোচ্ছে ১৯৮৯ সালে পশ্চিম বাংলার নকশালপন্থীদের হাল-হকিকত সম্পর্কিত। অনেকের মতে, ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত মোট তেরো বছরের নকশাল আন্দোলন এখন বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের অধ্যায় মাত্র। কিন্তু বাস্তবে কি তাই?
তা'হলে তো গোড়া থেকেই সংক্ষিপ্ত আকারে কথাগুলো বোলতে হোচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের ওধারে শিলিগুড়ি। আর এই শিলিগুড়ির অদূরে ৩টি থানা যথাক্রমে ‘ফাঁসি দেওয়া’, ‘খড়িবাড়ি’ এবং ‘নকশালবাড়ি’। আজ থেকে ২২ বছর আগে এই এলাকার শোষিত ক্ষেতমজুর এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের নেতৃত্বে ঘোষিত হোয়েছিলো এক ‘রক্তাক্ত সশস্ত্র বিপ্লব’। নেতার নাম কমরেড চারু মজুমদার। জন্ম বেনারসে (১৯১৭) এবং কলেজ জীবন পাবনার এডোয়ার্ড কলেজে।
নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের এহেন সন্তান চারু মজুমদার কলেজ জীবনের পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখেই যোগ দিলেন কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন দেশ বিভাগ হোয়ে গেছে। এসবের আরও দুই দশক সময় অতিক্রম করার পর কমরেড চারু মজুমদারের কর্মক্ষেত্র হোচ্ছে জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং-এর চা-বাগান ছাড়াও শিলিগুড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে। অভূতপূর্ব কর্মদক্ষতার মাঝ দিয়ে কমরেড মজুমদার সংগঠিত কোরলেন জলপাইগুড়ির চা-বাগান শ্রমিক এবং নকশাল বাড়ি এলাকার ভূমিহীন কৃষকদের।
এটা হোচ্ছে ১৯৬৭ সালের কথা। পশ্চিম বাংলার ক্ষমতায় তখন শহুরে বামপন্হী নেতৃত্বের যুক্তফ্রন্ট সরকার। অথচ সংসদীয় রাজনীতির তীর বিরোধিতা কোরে কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে তখন দ্রুত নকশাল আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটছে। মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী শহুরে ছাত্র-যুবকেরা ‘বিপ্লব রোমাঞ্চে’ অনুপ্রাণিত হোয়ে দলে দলে নকশাল আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু কোরছে।
বামপন্থী নেতৃত্বের যুক্তফ্রন্ট সরকারের কথা হোচ্ছে, অবিলম্বে রাজ্য সরকার নকশাল আন্দোলন দমনে সক্ষম না হোলে, কেন্দ্রীয় ইন্দিরা কংগ্রেস সরকার ‘আইন-শৃংখলা’ রক্ষার অছিলায় পশ্চিম বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি কোরতে পারে।
বামপন্থী যুক্তফ্রন্ট সরকারের ভূমি রাজস্বমন্ত্রী কমরেড হরেকৃষ্ণ কোনার স্বয়ং নকশালবাড়ি যেয়ে কয়েক দফা বৈঠক কোরলেন চারু মজুমদার আর কানু সান্যালের সংগে। বহু অনুরোধ-উপরোধ কোরলেন ‘হটকারী নকশাল’ পথ পরিত্যাগের জন্য। শেষ অবধি আলোচনা ব্যর্থ হলো।
পক্ষান্তরে কমরেড মজুমদার সিপিএম-এর সংশোধনবাদী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই-এর আহবান জানালেন। তাঁর সুস্পষ্ট বক্তব্য হোচ্ছে:
“ভারতের কম্যুনিষ্ট পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটি একটি রাজনীতিক পন্হা গ্রহণ করেছেন যা মূলতঃ বিপ্লববিরোধী; চেয়ারম্যান মাও-সে-তুঙের চিন্তা এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী; শ্রেণী সমঝোতা ও সংশোধনবাদী আদর্শবাদের ভিত্তিতে গঠিত।… স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় কমিটি কোন বিপ্লবী কমিটি নয়। অতএব, প্রত্যেক মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর বিপ্লবীর কর্তব্য হল এই কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা।”
১৯৬৭ সালের শেষ প্রান্তে এসে মার্কসবাদী কম্যুনিষ্ট পার্টির দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন। সিপিএম-এর নিজস্ব হিসাব মতো, মাত্র ৪৮ মাস সময়ের ব্যবধানে পার্টির সদস্য সংখ্যা হ্রাস প্রায় ৪১ হাজারের মতো। ১৯৬৪ সালে যেখানে পশ্চিমবঙ্গে ‘রেড কার্ড’ মেম্বারের সংখ্যা ছিলো ১,০৬,৩১৩ জন; ১৯৬৮ সালে তা ৬৫,৪০২ জনে নেমে আসে।
এখানেই শেষ নয়। সিপিএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাবিত বর্ধমান সম্মেলনের আগেই ‘হটকারী দর্শনের’ কট্টর সমর্থক ৪০০ জন নেতা-উপনেতাকে বহিষ্কার করা হলো। এঁদের উলেখযোগ্য হোচ্ছেন সর্বকমরেড চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, সৌরেন বসু, সুশীতল রায় চৌধুরী প্রমুখ।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত হলো ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটি’। ইংরেজী মাসিক ‘লিবারেশন’ এবং বাংলা সাপ্তাহিক ‘দেশব্রতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো এঁদের চাঞ্চল্যকর কথাবার্তা:
“...এ আর গোপন নেই যে, এই সব লোক (জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সিপিএম), কৃষকদের সংগ্রামকে রক্তে নিমজ্জিত করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীগুলির হাতিয়ার হিসাবে, তাঁদের রাষ্ট্র প্রশাসন যন্ত্রের অংশ হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিক্রিয়ার এই সব দালাল, যাঁরা মার্কসবাদী বলে মুখোশ পরে বেড়ান, বর্ধমান (প্লেলাম) তাঁদের মুখোশ খুলে ফেলার কাজ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments