জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল : সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মধ্যে ‘মুজিববাদ’ এবং ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এই দুই শ্লোগানের পরিচয়ে এক দ্বিধা-বিভক্তি ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে ৷ ঐ বৎসরের ২৩শে জুলাই একই সময়ে রেসকোর্স এবং পল্টন ময়দানে পৃথক পৃথক সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছাত্রলীগের এই দ্বিধা-বিভক্তি চূড়ান্ত সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। একদিকে যখন ‘মুজিববাদ’-পন্থী ছাত্রলীগ দেশে ‘মুজিববাদ’ প্রতিষ্ঠার শপথ নেয়, অন্যদিকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে’র অনুসারী ছাত্রলীগ দেশে ‘শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা নেয়। ১৭ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস উপলক্ষে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় আ স ম আবদুর রব একটা পার্টি গঠন করার ইঙ্গিত দেন। ৩১শে অক্টোবর মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) জলিল এবং আ স ম আবদুর রবকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে’র ৭ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়; আর ২৪শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এক্সট্রা কাউন্সিলে এই নতুন দলের ১০৫ সদস্যের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে এই নতুন দল ‘জাসদ’ বুর্জোয়া শোষক শ্রেণীর সরকার বলে ঘোষণা করে এবং তাকে উৎখাতের সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। অবিভক্ত ছাত্রলীগের একটা বিরাট এবং তুলনামূলকভাবে সচেতন, নিষ্ঠাবান ও ত্যাগী মনোভাবাপন্ন অংশকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী’ ছাত্রলীগ এবং জাসদ আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। অন্যদিকে স্বাধীনতা পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাসদের জনসভাগুলোতে বেশ জনসমাগম হতে থাকে।

১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে জাসদপন্থী ছাত্রলীগ জয়লাভ করে (যদিও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের কারণে ফলাফল প্রকাশিত হতে পারেনি)। সব মিলিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে উৎখাতের ব্যাপারটা জাসদ খুব আশু লক্ষ্য হিসাবে আনে। সরকারের বিরুদ্ধে জাসদ একের পর এক কার্যক্রম গ্রহণ করতে থাকে। পরপর ৩০শে ডিসেম্বর ও ২০শে জানুয়ারী (যথাক্রমে ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের) প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। ৮ই ফেব্রুয়ারী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। এবং ১৭ই মার্চ পল্টন ময়দানের এক উত্তেজিত সভা শেষে জাসদের বিরাট মিছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ী ঘেরাও করে। ঘটনা এক পর্যায়ে গুলি বর্ষণে পৌঁছায় এবং জাসদের বেশ কয়েকজন কর্মী নিহত হন। ঘটনার প্রেক্ষিতে জাসদের নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীদিন হরতালের আহ্বান সত্ত্বেও তা সফল হয় না। ১৭ই মার্চের ঘটনার পর জাসদকে আর বেশী মিটিং, মিছিল ইত্যাদি করতে দেখা যায় না। এই সময় থেকে গোপনে গড়ে উঠতে থাকে ‘গণবাহিনী’, যদিও তখন পর্যন্তও তার কর্মতৎপরতা তেমন প্রকাশ্য রূপ লাভ করে না। ‘গণবাহিনী’র তৎপরতা সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয় ১৯৭৫-এর ৭ই নভেম্বরের ঘটনাবলীর সময়। ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানে সামরিক বাহিনীর সিপাহীদের সাথে ‘গণবাহিনী’র সদস্যরাও যোগ দেয়। কিন্তু অভ্যুত্থানের উপর শেষ পর্যন্ত জাসদপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার সাথে সাথেই পুনরায় জাসদ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ঘটানোর অভিযোগ আনেন। বিশেষভাবে অভিযুক্ত হন কর্নেল তাহের। গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়, এবং তা কার্যকরী করার ফলে অকুতোভয় কর্নেল আবু তাহেরের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্যদের সকলকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এ ছাড়া ‘গণবাহিনী’র সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজনের বিরুদ্ধে একটা সাধারণ গ্রেফতার ও ট্রাইব্যুনাল অভিযানও চালানো হয় ৷ এইভাবে ৭ই নভেম্বর এবং পরের ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ইতিহাসের একটা ঘটনাবহুল, রক্তাক্ত ও বিচিত্র অধ্যায়ের শেষ হয়।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice