মুক্তিযুদ্ধ ও কমরেড মণি সিংহ
কমরেড মণি সিংহ আজন্ম সংগ্রামী এক বাঙালি বীর পুরুষ। তিনি ছিলেন এ দেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের স্থপতি। তিনি ছিলেন এ দেশের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনের অগ্রসেনা। সারা জীবন আন্দোলন করেছেন নিপীড়িত-নির্যাতিত-মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য।
মেহনতি শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে কমরেড মণি সিংহ জীবনের বহু সময় থেকেছেন আত্মগোপনে। বহুদিন তিনি বন্দি থেকেছেন জেলে। ১৯৬৭ সালে বন্দি হয়ে দীর্ঘদিন তিনি জেলে ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনের চাপে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁকেও মুক্তি দেয়। কিন্তু ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে জেনারেল ইয়াহিয়া সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করলে সে বছরই জুলাই মাসে কমরেড মণি সিংহকে গ্রেপ্তার করা হয়। এবার গ্রেপ্তার হয়ে তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২৫ মার্চের পরে রাজশাহী কারাগার ভেঙে বন্দিরা তাঁকে বের করে নিয়ে আসে।
উল্লেখ্য, রাজশাহী জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায়ই কমরেড মণি সিংহ বঙ্গবন্ধুর ৭মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনেন। এ ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন ও সমর্থন জানিয়ে রাজশাহী জেল থেকে একটি টেলিগ্রাম করতে চান। জেল কর্তৃপক্ষ জানান, ‘আপনি তো টেলিগ্রাম করতে পারবেন না, কারণ আপনি ডেটিনিউ (রাজবন্দি)। আপনার টেলিগ্রাম পাঠাতে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অনুমোদন লাগবে।’ জবাবে কমরেড মণি সিংহ বলেন, ‘তবে অনুমোদন নিয়ে আসুন।’ তারা বলে যে, ‘এখন অনুমোদন আনা যাবে না, কারণ পুলিশ ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকজন কাজ করছে না, তারা সবাই অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।’ এতেই তিনি বুঝতে পারেন গোটা জাতি স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের পর কয়েকজন সহকর্মী কমরেড মণি সিংহকে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যান। তিনি সেখানে গিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোভিয়েত রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তিনি নিজের দল কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য সবাইকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।
২৫ মার্চের পর কমিউনিস্ট পার্টির অন্য নেতারা দেশ ত্যাগ করে ভারতে যান। তাদের অধিকাংশই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নেন। ওই সময় গোটা পার্টি-সংগঠন সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দেশের ভেতরে বিভিন্ন জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির বেশ কিছু নেতা-কর্মী থেকে গিয়েছিলেন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী সব নেতা-কর্মীর ও সাধারণ মানুষের আশ্রয়, খাদ্য প্রভৃতির ব্যবস্থা করা এবং ভেতরে-বাইরে সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা, সংগঠন গুছিয়ে নেয়া এবং তাড়াতাড়ি সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা প্রভৃতি অত্যন্ত কঠিন কাজ তখন পার্টির সামনে ছিল। মণি সিংহের দক্ষ নেতৃত্ব-গুণেই পার্টির নেতা-কর্মীদের সবকিছু হাসিমুখে দৃঢ়তার সঙ্গে সহ্য করা এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য দেশপ্রেমিক শক্তির সাহায্যে অতি অল্প সময়েই পার্টির পক্ষে কাজগুলি গুছিয়ে তুলে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করা সম্ভব হয়।
ভারতের আগরতলায় গড়ে তোলা হয় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের বড় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে যুবক-তরুণদের রিক্রুট করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং প্রশিক্ষণশেষে দেশের ভেতরে পাঠানো হয় পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালনায় ছিলেন কমরেড অনিল মুখার্জী, কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী ও কমরেড বারীণ দত্ত। প্রশিক্ষণ ও রিক্রুটমেন্টের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। এখানে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীতে ৫ হাজার যুবককে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য পাঠানো হয়। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। বিশেষ করে কুমিল্লার বেতিয়ারায় এক সম্মুখযুদ্ধে কমরেড নিজামুদ্দিন আজাদ, সিরাজুম মুনিরসহ বেশ কয়েকজন শহীদ হন। এছাড়া আরো ১২ হাজার যুবককে সংগঠিত করে মুক্তিবাহিনীতে পাঠানো হয়। অর্থাৎ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments