-
নজরুল ইসলাম অনেক দিন থেকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। এর দৈহিক ওজন আমাদের জানা আছে, আত্মিক, ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।
জনগণ, ভদ্র সাধারণ এখনও মরে বেঁচে আছে, আসছে সার্বিক নিপাট মৃত্যু এদের জন্যে—এবং তার ভিতর থেকেই আরো এবার বেঁচে ওঠবার অধ্যায়—জীবনকে নতুন ক’রে প্রতিপালন করবার প্রযোজনে।
কিন্তু আমাদের সামাজিক জীবনে এই মৃত্যু ও জীবন যে যার কাছে দুরতিক্রম্য নয়। যতদূর ধারণা করতে পারি, এই মানুষের পৃথিবীতে অনেকদিন থেকে এইরকমই চলেছে, একটা সময়—বৈশিষ্ট্য ক্ষয়িত হয়ে নতুন সাময়িকতাকে নিয়ে আসে। এতে সমাজ কাজে উন্নত না হোক (বা হোক), মূল্যচেতনায় স্থিরতর হবার অবকাশ পায় ব’লেই তো মনে হয়। প্রবীণ বিরস মনীষীরা যাই ভাবুন না
-
আজি এই পূণ্য দিনে
গাঁয়ের কিসান
কি গাহিব গান—
নাই ভাষা
দৈন্য হতাশায়
মন ম্রিয়মান।
হয়ত বা কেহ কেহ
বসি নিজে চৌতালের ‘পরে
গর্ব করে
শিখিয়াছি রবীন্দ্রের গীতি
গাই নিতি
বেহাগ খাম্বাজ ও ভৈরবী
নানাবিধ সুরে।
হয়ত বা দু’একটি পল্লীর গান
কাকডাকা সুরে
আমিও দিয়াছি টান
লোক দেখানোর তরে,
সে-সুর বেসুর বাজে
পৌঁছে নাই সবার অন্তরে।
ভেঙ্গে গেছে মানুষের মন
ভেঙ্গে গেছে কুঁড়ে ঘর
কামার ছেড়েছে গ্ৰাম
গুটায়ে হাপর,
জেলে কাঁদে জাল নাই
তাঁতী ব'সে গুটাইয়া তাঁত
এদের কান্নার সুরে
কেবা করে কর্ণপাত।
অজ্ঞতায় অন্ধকারে আছি
কোটি কোটি পুরুষ রমণী
কেউ দেয় নাই জানি
তব বাণী—
দীপশিখা খানি
এদের সম্মুখে
-
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না;
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন—
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্
আমি একাই—ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন—
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে—আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তিতা তো অনুভব করেছো বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী
-
বাংলা কবিতা তথা বাংলা সাহিত্যের কোনো ইতিহাস গ্রন্থেই কবি জালাল উদ্দীন খাঁর নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধুনিক বাংলার বিদগ্ধ কবি বা কবিতা- অনুরাগীদের মধ্যে যাঁরা জালাল উদ্দীন খাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত তেমন মানুষের সংখ্যাও নিশ্চয়ই বেশি নয়। সেই বিরলসংখ্যক মানুষের মধ্যেও কি এমন কাউকে পাওয়া যাবে যিনি অকুণ্ঠচিত্তে জালাল খাঁর রচনাকে বাংলা কবিতার মূলধারার অন্তর্গত বলে বিবেচনা করতে পারবেন? মনে তো হয় না।
আমরা, ‘শিক্ষিত’ মানুষজন, আসলে কতকগুলো দুর্মর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এগুলো ‘আধুনিকতা’র কুসংস্কার। তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাই আমাদের মস্তিষ্ককোষে সেইসব কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়ে নিদারুণ মানস-প্রতিবন্ধের সৃষ্টি করেছে। সে রকম মানস-প্রতিবন্ধের দরুনই আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসকেও আমরা খণ্ডিত করে ফেলেছি, একটা
-
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাকগদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!
প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা—কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় :পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি।।|
ছাড়পত্র
-
দ্রাবণের একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে, অতিরিক্ত দ্রব্যকে তলানি হিসেবে পড়ে থাকতে হয়। কোনো সংবাদ শুনে মন আন্দোলিত হওয়ারও তেমনি একটা মাত্রা আছে, তারপর ভোঁতা মনে দুঃসংবাদ অথবা সুসংবাদ কোনোটাই তেমন সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় না। সীমান্তের ওপার থেকে আরো হাজারো দুঃসংবাদের মতো খবর এসেছে যে, সকল গণআন্দোলনের অনুপ্রেরণা ও শত স্মৃতিমাখা ঢাকার শহীদ মিনারটি ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ধ্বংস করেছে, ধ্বংস করেছে ভাষা আন্দোলনের অন্য আর একটি স্মৃতি বাংলা অ্যাকাডেমিকে। ১৯৬২ সালের ভাষা আন্দোলনের দুটি অক্ষয় স্মৃতিকে এমন পাষণ্ডের মতো বিনষ্ট করার বর্বরতা ও নির্লজ্জতা দখলদারি সৈন্যরা দেখাতে পেরেছে অনায়াসে। আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ইয়াহিয়া যে কোনো নীচতার আশ্রয় নিতে পারে।
-
চিরকেলে গোলাপ আর কবিতার দেশ আজ কিছুকাল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিক ঘূর্ণিপাকের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের সোভিয়েট-বিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রাচ্যদেশীয় বুহ্যমুখ, অন্যদিকে কেন্দ্ৰীয় সরকারের প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে আজেরবাইজান ও কুর্দিস্তানের অধিবাসীদের স্বাধিকার-চেষ্টার লড়াইয়ের পটভূমি—এ-ই ইরান। আজকের এই ইরান আমাদের ‘জাতীয়তাবাদী’ দৈনিকপত্রের অনেক শোকাশ্রু ও প্রেমাশ্রুবর্ষণের কারণ। শোকাশ্ৰু—সোভিয়েট ‘সাম্রাজ্যবাদের’ ঘরভাঙানি মতলব আবিষ্কারের ফল; প্রেমাশ্রুবর্ষণ অবশ্যই কায়েমী মালিকানার ‘গণতান্ত্রিক ঔদার্যে’ আমাদের অবিচলিত আস্থার তদ্গতভাব!
কিন্তু এই ভারতীয় শোকাশ্রু-প্রেমাশ্ৰু মায় স্বস্তি-পরিষদীয় কুম্ভীরাশ্রুও শেষপর্যন্ত নিছক অরণ্যরোদনেই পর্যবসিত হ'লো ৷ দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়ার প্রবল শক্তির মুখে তুড়ি দিয়ে ইরানী-সোভিয়েট চুক্তি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে, এমন কি ক্রমে ক্রমে দুর্জ্ঞেয় আজেরবাইজানী সমস্যাও সুমীমাংসিত হ'লো৷ যদিও এই ভাঙা-হাটে আন্তর্জাতিক কীর্তনীয়ারা থেকে থেকে এখনও
-
বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক। নদী ছিল বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আজ যে-টুকু বাংলা আমাদের, সে বাংলা তেমন নদীবহুল নয়। যে-অংশ নদীবহুল এবং নদীর খেয়ালখুশীর সঙ্গে যে অংশের মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে বাঁধা সে অংশ আজ আমাদের কাছে বিদেশ। অদৃষ্টের এ পরিহাস রবীন্দ্রনাথের কাছে ভয়ানক দুঃখের কারণ হত।
প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল। সেদিক থেকে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থের সগোত্র ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে নদী কবিকে বোধহয় সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ ক’রেছিল। তাই কবি নদীর কাছে সময়ে অসময়ে ছুটে গেছেন। তাই তিনি নদীর বুকে নৌকাতে ভাসতে এত ভালবাসতেন। নদীর তরুণীসুলভ চাপল্য এবং গতি কবির চিরতরুণমনে গভীর দাগ কেটেছিল। তাছাড়া সংসারের কোলাহল থেকে মুক্তি
-
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান,
দেহের স্বাদের কথা কয়;
বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট ক’রে দেবে তার সাধের সময়
চারিদিকে এখন সকাল—
রোদের নরম রং শিশুর গালের মতো লাল;
মাঠের ঘাসের ’পরে শৈশবের ঘ্রাণ—
পাড়াগাঁর পথে ক্ষান্ত উৎসবের এসেছে আহ্বান।
চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা-ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল;
প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসে
পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাঁড়ারের দেশে!
শরীর এলায়ে আসে এইখানে ফলন্ত ধানের মতো ক’রে,
যেই রোদ
-
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহস্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহবিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সেই নেই ভয়পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়—আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্যবাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্যসঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ঙ্করতাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখরএ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বারপথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভারক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসেঅবিশ্রান্ত; একে একে হয়
-
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।
আর-পারে আমবন তালবন চলে,
গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।
তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।
সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।
বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।
আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া
-
১
শ্রমজীবীরা বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছে অথবা আজ হোক কাল হোক করবে। সমস্ত মৌল অর্থনৈতিক সম্পদে ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানাজারী প্রথম কাজ। শিল্পকলা সাহিত্যেরও দখল নেয়া এই কাজের অন্তর্ভুক্ত। এই একান্ত বাস্তব ও অনিবার্যভাবে সম্ভাব্য বাস্তব থেকে উদ্ভব হয়েছে সাহিত্য শিল্পকলার নতুন সংজ্ঞা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদের। এই সংজ্ঞার মূলসূত্র, শ্রমজীবী মানুষের কর্মকাণ্ড এবং ইচ্ছা ও অনুভবই সাহিত্য- শিল্পকলার চালকশক্তি।
এই সংজ্ঞার সূচনা ঐতিহাসিকভাবে সোভিয়েত অক্টোবর বিপ্লবে, কারণ এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই প্রথম শ্রমজীবীদের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা এবং সাহিত্য শিল্পকলার প্রবর্তন হয়েছে।
মায়াকভস্কির বিশেষত্ব এই যে, যাঁরা সাহিত্য শিল্পকলায় শ্রমজীবীদের দখল নেয়ার কাজে সৃজনশীলতায়
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- কাইফি আজমি (১)
- কাজী নজরুল ইসলাম (৫)
- জীবনানন্দ দাস (১০)
- জয়নাল হোসেন (১)
- নিবারণ পণ্ডিত (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১)
- বিষ্ণু দে (১)
- মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় (১)
- মলয় রায়চৌধুরী (১)
- মেহেরুন নেসা (১)
- যতীন সরকার (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (১)
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১)
- লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (১)
- শামসুর রাহমান (১)
- সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় (১)
- সুকান্ত ভট্টাচার্য (৯)
- হরবোলা (১০)
- হাফেজ শিরাজি (১)
- হাসান মুরশিদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.