চেলকাশ
দক্ষিণের নীল আকাশটুকু ধুলোয় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে; প্রদীপ্ত সূর্য যেন ধূসর পর্দার ভিতর দিয়ে আব্ছা দৃষ্টিতে হরিৎ সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। জলে সূর্যের প্রতিবিম্বটুকুর পর্যন্ত অবসর নেই, কর্মব্যস্ত বন্দরের সেই জল ক্রমাগত দাঁড়ের আঘাতে আর স্টীমারের চাকার আবর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, দিকবিদিক—গামী তুর্কী জাহাজ ও নানা অর্ণবপোত অবিরাম সমুদ্রের জল যেন চষে চলেছে; উন্মুক্ত ঢেউগুলি গুরুভার জলযানের চাপে পাষাণ প্রাচীরে অবরুব্ধ হয়ে জাহাজের গায়ে ও তটভূমিতে আছড়ে পড়ছে। মন্থনক্ষুব্ধ ফেনিল ও আবর্জনাময় জলরাশি আছড়ে পড়ে যেন তার অভিযোগ জানায়।
নোঙরের শিকলের ঝন্ঝন শব্দ, মালবাহী রেলগাড়ির ঝম্ঝমানি, পাথরের মেঝের উপর লোহার পাত ফেলার তীব্র ঝনৎকার, কাঠ নামানোর দুমদাম শব্দ, ভাড়াটে গাড়ির ঘড়ঘড়ানি, স্টীমারের হুইসিল কখনো তীক্ষ্ম কখনো গম্ভীর। ডকের কুলি, নাবি ও কাস্টম্স্ অফিসারদের চেঁচামেচি—সব একসঙ্গে মিশে কর্মব্যস্ত দিনের কোলাহল কানে তালা ধরিয়ে দেয়। বন্দরের আকাশের নীচে এই কোলাহল দাঁড়িয়ে থাকে। মাটির থেকেও ক্রমাগত শব্দের তরঙ্গ উঠে সেই কোলাহলের সঙ্গে মিশে গুরুগম্ভীর প্রতিধ্বনিতে চারিদিক কাঁপিয়ে তোলে; কান ঝালাপালা করে দেয়, ধূলি সমাচ্ছন্ন গরম বাতাসকে ছিন্নভিন্ন করে।
পাথর, লোহা, কাঠ, বন্দরের শান বাঁধানো মেঝে, জাহাজ, লোকজন—সবকিছু যেন মার্কারি’র প্রতি সশব্দ স্তবগীতের কলোচ্ছ্বাস হয়ে ফুলে ফুলে উঠছে। কিন্তু মানুষের কন্ঠস্বর এই স্তবগীতের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষীণ, অস্পষ্ট ও হাস্যকর। মানুষই সৃষ্টি করেছে এই সব কোলাহল অথচ তাকে দেখেই হাসি পায়, করুণা হয়; ক্ষুদ্রকায়, নোংরা, শীর্ণ, দুর্বল জীব, পিঠে বোঝার ভারে নত হয়ে তাড়াতাড়ি ইতস্তত ছুটোছুটি করে চারিদিকের ধূলোয় মেঘে, ঝম্ঝম শব্দে ও উত্তাপের সমুদ্রে। বিরাট বিরাট লৌহদানব, পর্বতপ্রমাণ মালের গাঁট, বজ্রনির্ঘোষকারী বড় বড় মালগাড়ি—এ সব মানুষেই সৃষ্টি করেছে, তবুও তাদের তুলনায় মানুষ কত তুচ্ছ! তাদেরই সৃষ্টি আজ তাদের কৃতদাস করে রেখেছে, যা-কিছু ব্যক্তিত্ব নিঃশেষ হরণ করে নিয়েছে।
বিরাট দৈত্যের মত ভারী স্টীমারগুলো ধের্ঁায়া ছেড়ে, বাঁশারী শব্দের সঙ্গে হিস্ হিস্ করে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, শুনে মনে হয়, যেন প্রতি শব্দ মানুষের ধূলিধূসর চেহারার দিকে তাচ্ছিল্য ভরে বিভ্রুপ করে। মানুষগুলো পাটাতনের আশে পাশে ঘুরে বেড়ায়, আর কৃতদাসের মত পরিশ্রম করে যা সব উৎপন্ন করেছে তাই দিয়ে স্টীমারগুলোর গভীর উদর বোঝাই করে। হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে এই দেখে যে সারি সারি কুলি হাজার হাজার মণ রুটি পিঠে করে নিয়ে জাহাজের লৌহ-উদরের নিক্ষেপ করে শুধুমাত্র নিজের পেট ভরাবার জন্যে কয়েক সের সেই রুটি পাবে বলে। মানুষ শব্দ ও উত্তাপে অবসন্ন, ঘামে ভিজে উঠেছে, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে, পোষাক ছিন্নভিন্ন আর যে সব বিরাট যন্ত্রগুলিকে তারা সৃষ্টি করেছে সে সব যন্ত্র উজ্জ্বল, সযত্নপুষ্ট, সূর্যের আলোকে ঝক্ঝক্ করে! এই সব কল-কব্জা বাষ্পের সাহায্যে সচল হয়নি, সচল হয়েছে তাদেরই স্রষ্টার মাংস-পেশী ও রক্তে, এই বৈষম্যের মধ্যে ক্রুর পরিহাসের এক কাব্য যেন পড়া যায়।
আর্ত কোলাহলে দেহমনে উৎপীড়িত, ধূলায় নাসারন্ধ্র উত্ত্যক্ত আর দৃষ্টি অন্ধ হয়ে আসে, অত্যধিক উত্তাপে সর্বাঙ্গ ঝলসে যায় ও অবসন্ন হয়ে পড়ে। সবকিছু এই মুহূর্তেই যেন ফেটে চৌচির হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে, তারা যেন আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারছে না, এখনই যেন একটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয়, একটা ভীষণ বিপ্লবের মধ্যে ভেঙে পড়ে যাবে আর তারপর সুস্থ হাওয়ায় মানুষ সহজ স্বাধীনভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে, পৃথিবীতে আসবে শান্তি; ধূলিধূসর কোলাহল যে কান ঝালাপালা করে, মনকে উত্ত্যক্ত করে, যাতে মানুষের পাগল হয়ে উঠে, তারই অবসান হয়ে যাবে। সমুদ্র, আকাশ ও শহরে বিরাজ করবে একটা নির্মল আনন্দময় শান্তি...।
ঢং ঢং করে বারটা বেজে গেল। শেষ শব্দটা মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments