মেসোপটেমিয়ার বিজ্ঞান
মেসোপটেমিয়ার বিজ্ঞান সম্বন্ধে কিছু বলার আগে আসেরিয়ার দ্বিগ্বীজয়ী সম্রাট আসূরবানিপালের কাছে আমাদের ঋণের স্বীকার করা দরকার। কারণ, মেসোপটেমিয়া সম্বন্ধে আজ যতটুকু জানতে পেরেছি, তার প্রায় সবটাই তাঁর কল্যাণে। আসিরিয়ার পূর্ববর্তী কীর্তিধর রাজাদের জয় করা সাম্রাজ্যসীমা তিনি আরও বিস্তৃত করেছিলেন। বিদ্রোহী প্রজাদের নির্মমভাবে হত্যা করতেন তিনি, ধ্বংস করতেন তাদের নগর। আসিরীয় নিষ্ঠুরতা তখনকার সভ্যজগতে ত্রাসের ব্যাপার ছিল। আসূরবানিপালের নামে মিশর থেকে পারস্য পর্যন্ত সবাই আতঙ্কিত হতো। যুদ্ধপ্রিয়, নির্মম আর নৃশংস ছিল এই আসিরীয়রা। শুধু তরবারির শাসনে এক বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য তারা টিকিয়ে রেখেছিল দীর্ঘকাল। সমস্ত সাম্রাজ্য লুঠ করা সম্পদে রাজধানী নিনেভা হয়ে উঠেছিল অনুপমা, অতুলনীয়া।
যুদ্ধক্ষেত্রে যিনি পরিচয় দিতেন চূড়ান্ত বর্বরতার, ভাবতেই আশ্চর্য লাগে এই নির্মম লোকটি রাজধানী নিনেভায় সে যুগের শ্রেষ্ট গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন। এমন কোনো বিষয় নেই যা সম্বন্ধে নিনেভার গ্রন্থাগারে কোনো বই ছিল না (বই বলতে অবশ্য এখানে মৃৎফলক বোঝাচ্ছে, সুবিধার জন্য আমরা বই বলব)। আসলে গ্রন্থাগারটিকে আকাদমী অথবা বিজ্ঞানভবন বললেই তার উচিত সম্মান দেয়া হবে। আসিরীয় ভাষায় গ্রন্থাগারটির নাম ‘বিৎ সুম্মি’ অর্থাৎ ‘জ্ঞান-গৃহ’। এই জ্ঞান-গৃহ সম্বন্ধে আসূরবানিপালের কি রকম উৎসাহ ছিল তা বোঝা যাবে তাঁর লেখা এই চিঠি থেকে। এই চিঠি তিনি লিখেছেন প্রাদেশিক শাসনকর্তার কাছে:
‘তুমি আমার এই চিঠি পাবার পর তিনজন লোক (তিনজনের নাম) এবং বরসিপ্পা নগরের পণ্ডিতদের নিয়ে সমস্ত মৃৎফলক খুুঁজে বের করবে, তাদের বাড়িতে এবং এজিদা মন্দিরে যত আছে সমস্ত...
সমস্ত মূল্যবান মৃৎফলক খুঁজে বের করবে, যেগুলো তোমার সংরক্ষণাগারে আছে এবং যেগুলো আসিরিয়ায় নেই সেগুলো সব আমার কাছে পাঠাবে। আমি রাজকীয় কর্মচারী আর ঠিকাদারদের কাছে লিখেছি... কেউ কোনো মৃৎফলক লুকিয়ে রাখবে না। এমন কোনো মৃৎফলকের খোঁজ তুমি যদি পাও, যার সম্বন্ধে আমি তোমার কাছে লিখিনি কিন্তু মূল্যবান মনে হয়, তবে সেটা বের করে আমার কাছে পাঠাবে।’
এই ছিল আসূরবানিপালের উদ্যম, যার ফলশ্রুতি হিসেবে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত প্রদেশ হতে এসেছে প্রতিটি মৃৎফলক, তাঁর আকাদেমীতে। ১৮৫০ খৃষ্টাব্দে ইংরেজ পুরাতত্ত্ববিদ হেনরী লেয়ার্ড এই বিখ্যাত গ্রন্থাগার নিনেভার ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে খুঁড়ে বের করলেন।
গ্রন্থাগার থেকে আমরা সাহিত্য-কাব্যের মধ্যে পেয়েছি বিখ্যাত গিলগামেশ কাব্য, নারাম-সিনের উপাখ্যান, ন্যায়পরায়ণ যন্ত্রণাভোগীর গল্প, নিপ্পুরের এক দরিদ্রের কাহিনি, প্লাবনের কাহিনি, বিশ্বসৃষ্টির পুরাণ, ধর্মসঙ্গীত ইত্যাদি। বিজ্ঞানের মধ্যে, উদ্ভিদ-বিজ্ঞান, প্রাণি-বিজ্ঞান, খনিজ-বিজ্ঞান, ভৌগলিক বিবরণ, চিকিৎসা শাস্ত্র, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন ইত্যাদি। এক কথায় আমরা এক বিশ্বকোষ গ্রন্থাগারে পেয়েছি। এগুলো ছাড়া অসংখ্য ব্যবসায়িক দলিল, প্রায় ১৪০০ বৎসর সময়-ব্যাপী রাজকীয় পত্রাবলী এবং অন্যান্য বিষয়ে আরো দলিল। আরো পাওয়া গেছে চিত্রলিপির মৃৎফলক। মৃৎফলকে চিত্রলিপির পাশাপাশি আসিরীয় ভাষায় তার অর্থ দেয়া আছে। আসূরবানিপালের সময় থেকে (খৃষ্টপুর্ব ৬৬৮ অব্দ) ২৬০০ বছর আগে এই চিত্রলিপির ব্যবহার লুপ্ত হয়েছিল। সর্বোপরি পাওয়া গেছে সুমেরীয় ভাষার মৃৎফলক। সুমেরীয় আসিরীয় অভিধান এবং সুমেরীয় ব্যাকরণ—সবই সুমেরীয় ভাষা পড়বার জন্য। এগুলোর সাহায্য ছাড়া আজ আমরা কখনই সুমেরীর ভাষার পাঠোদ্ধার করতে পারতাম না। এ মৃৎফলকগুলোও আসূরবানিপালের সময় থেকে ২০০০ বছর আগেকার। আসূরবানিপালের গ্রন্থাগার সম্বন্ধে দীর্ঘ আলোচনা করলাম, কারণ গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত। মানুষের সমৃদ্ধ মনীষার পরিচয় গ্রন্থাগার বহন করে।
মেসোপটেমিয়ার বিজ্ঞানের মধ্যে আমরা মাত্র দুটো বিষয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো। বিজ্ঞান দুটি হচ্ছে গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা। এ দুটো বিজ্ঞানই সে সময় সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় ছিল। এবং দুটোরই পরীক্ষা করে সত্যাসত্য নির্ণয় করা যেত।
ব্যাবিলনীয়দের গণিত ছিল বীজগণিত নির্ভর। আবার সুমেরীয়রা পাটিগণিতে বেশ পারদর্শী ছিল, তারা ষাট সংখ্যার একটা অঙ্কপাতন, পূর্ণসংখ্যা এবং ভগ্নাঙ্কের জন্য বের করেছিল। যার সাহায্যে তারা ভগ্নাঙ্কের গণনা পূর্ণ সংখ্যার মতন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments