ঘৃণা
"শত্রুকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতে না শিখলে তাকে পরাজিত করা যায় না।"
(পিপলস কমিসার অব ডিফেন্স ইউএসএসআর জে স্তালিন এ অর্ডার অব দ্য ডে, মে ডে, ১৯৪২)
যুদ্ধের সময় মানুষের মতো গাছদেরও নিজ নিজ ভাগ্য থাকে। আমি দেখেছি বিশাল এক বনভূমিকে আমাদের কামানের গোলায় ধ্বংস হয়ে যেতে। খুবই সম্প্রতি, অমুক গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে জার্মানরা এখানে বেশ ভালোভাবে গেড়ে বসেছিল, ভেবেছিল বহুদিন থাকবে এখানে, কিন্তু গাছগুলোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু তাদেরও ধ্বংস করে দিয়েছিল। ভাঙা গুঁড়িগুলোর তলায় মৃত জার্মানরা পড়েছিল, ফার্ন আর ব্র্যাকেন-এর সজীব শ্যামলিমার মধ্যে তাদের খণ্ডবিখণ্ড দেহগুলো পচছিল; কামানের গোলায় বিদীর্ণ পাইন গাছগুলোর আঠার সুগন্ধ ঐসব পচা দেহগুলোর শ্বাসরুদ্ধ করা, অস্বাস্থ্যকর তীব্র পূতিগন্ধ ঢেকে দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। গোলার আঘাতে সৃষ্ট তার মেটে রঙের পোড়া আর ক্ষণভঙ্গুর ধারওয়ালা গর্তগুলো নিয়ে, মনে হচ্ছিল মাটি যেন কবরের গন্ধ নিঃসারিত কবছে...।
আমাদের গোলার আঘাতে সৃষ্ট আর কর্ষিত ঐ ফাঁকা জায়গাটায় বিরাজ করছিল নীরব আর মহীয়ান মৃত্যু; কিন্তু ঐ ফাঁকা জায়গাটারই ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল নিঃসঙ্গ এক সিলভার বার্চ, কোন এক অলৌকিক ঘটনা বলে টিঁকে গিয়েছিল আর গোলার টুকরোর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শাখাগুলোকে বাতাসে নাড়া দিচ্ছিল আর তার চকচকে, চটচটে কচি পাতাগুলোর মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল।
খোলা জায়গাটার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। আমার একটু আগে এক তরুণ সিগনালার হালকাভাবে বার্চের গুঁড়িটা স্পর্শ করে আন্তরিক, সস্নেহ বিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিল, "এর মধ্যে দিয়ে কি করে বেঁচে বেরিয়ে এলে, তুমি?"
কিন্তু একটা পাইন গাছেব গায়ে গোলা লাগলে সেটা, যেন কাস্তে দিয়ে তাকে কাটা হয়েছে এমনিভাবে পড়ে যায়, রেখে যায় তার গা বেয়ে আঠা গড়ানো টুকরো হয়ে যাওয়া গাছের গোড়াটা, ওক গাছ মৃত্যুবরণ করে অন্যভাবে।
জার্মান কামানের এক গোলা নামহীন এক নদীর ধারের প্রাচীন একটা ওক গাছের ওপর এসে পড়েছিল। হাঁ করা এবড়োখেবড়ো ক্ষতটা অর্ধেকটা গাছের প্রাণশক্তি শুষে নিয়েছিল কিন্তু বাকি অর্ধেকটা বিস্ফোরণের ঘায়ে নদীর ওপর ঝুঁকে পড়ায়, বসন্তকালে আবার চমৎকারভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল, আর পাতায় পাতায় ছেয়ে গিয়েছিল। আজও পর্যন্ত নিঃসন্দেহে, অঙ্গহীন সেই ওক গাছটির নিচের দিকের শাখাগুলো স্রোতের জলে স্নান করে আর ওপর দিকের শাখাগুলো সাগ্রহে সূর্যের দিকে তাদের খোদাই করা পাতাগুলো বিস্তার করে দেয়।
দীর্ঘকায়, কিছুটা নুয়ে পড়া, উঁচু উঁচু চওড়া কাঁধ দুটোয তার চিলের মতো কেমন একটা ভাব যেন ছিল। লেফটেন্যান্ট গেরাসিমভ ট্রেঞ্চে ঢোকার মুখটাতে বসে, শত্রুর সেদিনের ট্যাঙ্ক আক্রমণ তার ব্যাটিলিয়ান যেটাকে প্রতিহত করেছিল তারই অবস্থাগত একটা বিবরণ আমাদের দিচ্ছিল।
তার শীর্ণ মুখটা ছিল শান্ত, প্রায় নিরাসক্ত বলা যায, তার আরক্ত চোখদুটো ক্লান্তিতে কুঞ্চিত। গুরুগম্ভীর গলায় সে কথা বলছিল আর মাঝে মাঝে তার গ্রন্থিল লম্বা লম্বা আঙুলগুলো অন্য হাতের আঙুলগুলো জড়িযে ধরছিল; অব্যক্ত দুঃখ কিংবা গভীর এবং বেদনাদায়ক চিন্তাভাবনাব অত্যন্ত বাত্ময় এই 'ভঙ্গি আশ্চর্যজনকভাবে, তার শক্তিশালী কাঠামো, তার পুরুষোচিত তেজোদ্দীপ্ত মুখ এর কোনটার সঙ্গেই খাপ খাচ্ছিল না।
হঠাৎ সে কথা বলা বন্ধ করলো, তার মুখে একটা পরিবর্তন দেখা গেল; তার রোদে পোড়া গালগুলো ফ্যাকাশে হয়ে গেল, পেশিগুলো কেঁপে উঠলো আর সামনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখদুটো প্রচণ্ড, দুর্দমনীয় এমন একটা ঘৃণায় জ্বলে উঠলো যে আমিও অনিচ্ছাকৃতভাবে তার দৃষ্টি অনুসরণ করার জন্য ঘুরে তাকালাম। আমাদের প্রতিরোধের অগ্রবর্তী সীমানার থেকে তিনজন জার্মান বন্দী জঙ্গল পার হচ্ছিল রোদে জ্বলা গ্রীষ্মের টিউনিকপবা, ট্রেঞ্চ ক্যাপ মাথার পিছনে হেলানো এক রেড আর্মির সৈনিকের তত্ত্বাবধানে।
রেড আর্মির সৈনিকটি মন্থরগতিতে, ছন্দময়ভাবে তার রাইফেল দোলাতে দোলাতে হেঁটে চলেছিল, সূর্যের আলোয় তার বেয়নেটটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments