ঢাকার পেশা
সমাজ এবং সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেক যুগে পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে। আমি আমার বাল্যকালে যে সব পেশার লোকদের দেখেছি, বর্তমানে হয় সে পেশার কোনো অস্তিত্বই নেই অথবা যদি থেকে থাকে তবে জীবস্মৃত অবস্থায় রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিজ অভ্যন্তরে একটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যদি এটি কোনোভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। আজকের আসরে সংক্ষিপ্তভাবে আমি কিছু শিল্পীদের উল্লেখ করব। আজ থেকে ত্রিশ বছর পূর্ব পর্যন্ত ঢাকায় 'বাদলাকশ' ছিল। এরা ছিল তাঁতিবাজারের বসাক। এরাই সোনালি তারের পাড়ের আবরণী (গোটা পটহা) তৈরি করত। সুস্পষ্টত এই পেশা মুসলমানদের সঙ্গে অন্য স্থান থেকে এসেছিল এবং মুসলমানদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এটিরও অবনতি ঘটে। শালকর এবং রিপুকার শুধুমাত্র মুসলমানগণই ছিল এবং এরা ওয়ারী এলাকায় বসবাস করত, যেখানে এখন সম্ভবত কোনো মুসলমান ঘর নেই। তারা সংখ্যায় একটি বড় দল ছিল। বর্তমানে কোনো শালকর নেই কিন্তু রিপুকার এখনও আছে, তবে খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, ঢাকায় রিপুকার নিজের কাজে খুবই সচেতন এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বোঝা যায় না এমন রিপু এবং পট্টি লাগিয়ে থাকে। এদের মাঝ থেকেই কিছু লোক শাল ধোলাই করে রং করত। কিন্তু পশমিনার' প্রচলন শেষ হবার ফলে এই পেশা নামে মাত্র রয়েছে। পেশাজীবীদের মধ্যে একদল আমামাবন্দ এবং শামলাবন্দদের ছিল। এরা ছিল একটি পৃথক দল কিন্তু আমি যখন দেখেছি, তখন এই কাজ (আমামাবন্দ ইত্যাদি) রিপুকারগণই করত এবং বর্তমানেও যদি কিছু থেকে থাকে তবে তাদের মধ্যেই রয়েছে।
মালী আমাদের পূর্ববর্তী সংস্কৃতির জরুরি উপাদান ছিল। কেননা আনন্দ থেকে বিষাদ পর্যন্ত প্রত্যেক অনুষ্ঠানে কাজে লাগত এবং তাদের সংখ্যাও যথেষ্ট ছিল। মালীবাগ, মালীটোলা এসব মহল্লায় তারাই বসবাস করত। বর্তমানে তারা নবাবগঞ্জের দিকে বাস করে। এরা সকলেই মুসলমান ছিল। ফুলের গহনা, সত্যিকার অর্থে অতুলনীয় ভাবে তৈরি করত। এখনও বিশেষ ফরমায়েশ হলে তারা উত্তম গহনা তৈরি করে থাকে। এখানে সুগন্ধী শ্রেণীর ফুলের বেশি প্রচলন রয়েছে। গজরা, বড়মালা, বিবাহের গহনা, সেহরা, খাটসজ্জা, তোড়া এবং খোদা জানেন কত ধরনের কাজ তাদের ছিল এবং রয়েছে। তাদের কিছু সংখ্যক চকে এবং কিছু সংখ্যক ইসলামপুরে তিন প্রহর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত রাস্তার পাশে নিজেদের ফুলের ঝুড়ি রেখে হার ইত্যাদি বিক্রি করে থাকে। এরা গরিব লোক এবং মুসলমান হিন্দু নির্বিশেষে সকলেই তাদের গুণগ্রাহী হওয়া সত্ত্বেও কেউই তাদের মধ্যে সচ্ছল নয়।
আজ থেকে পনের, ষোল বছর পূর্ব পর্যন্ত দর্জি শুধুমাত্র মুসলমানেরাই ছিল কিন্তু সম্প্রদায়গত তিক্ত অনুভূতি হিন্দু দর্জিও তৈরি করে দিয়েছে। আমার বাল্যকালে সেলাই মেশিন চালু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বিশেষ দর্জি বিশেষত যারা ইংরেজি কাজ করত তাদের ওখানেই সেলাই-কল দেখা যেত। এখন এটি দর্জিগিরির জন্য অপরিহার্য। ঢাকায় হাতের উত্তম সেলাই হতো এবং এত ধরনের সেলাই হতো যে বর্ণনা করলে বিস্তারিত বিবরণ ছাড়া কেউ বুঝতেও পারবে না এবং পোশাকের অনুপুঙ্খ বর্ণনার স্থানও এটি নয়। অন্যথায় আপনাদের আমি জানিয়ে দিতাম যে, কোন কাপড়ের জন্য কি ধরনের সেলাই আবশ্যকীয় ছিল। আমাদের বাল্যকালে মেশিনের সেলাই সংস্কৃতিবান এবং বিশিষ্ট লোকেরা খুবই অপছন্দ করতেন। দরজি সেলাই ছাড়াও কাটছাটের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজ করত। বাড়িতে সেলাইয়ের প্রচলন প্রচুর পরিমাণে ছিল। সুযোগ নেই, নাহলে আমি বিশদভাবে বলতাম যে, দরজিদের কাছে মহিলাদের কোন্ কোন্ কাপড় সেলাইয়ের জন্য পাঠানো হতো না। আমাদের দেখতে দেখতে এই পরিবর্তন হয়ে গেছে যে, বর্তমানে আচকান, আঙ্গারাখা", এবং সুরাহীদার আস্তিনের আচকান সেলাইকারী কারিগর কদাচিৎ পাওয়া যায় এবং 'আবা' ও 'ক'বা" সেলাইকারী কেউই নেই। অবশ্য চোগার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments