তেঁতুলিয়ার দুর্লভ গাঙ টিটি
লেখক: আ ন ম আমিনুর রহমান
জেমকন স্টেট হারবাল গার্ডেনের কর্মকর্তা অনুজ সাজ্জাদের আমন্ত্রণে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর দুর্গা পূজার ছুটি কাটাতে গেলাম পঞ্চগড়ে। ৬ অক্টোবর ওর সাথে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থান ও চা বাগান ঘুরে দেখছিলাম। বেলা সাড়ে এগারটায় পুরনো তেঁতুলিয়ায় পৌঁছালাম। মহিষের এক পরিত্যক্ত বাথান দেখে গাড়ি থেকে নামলাম। সামনেই মহানন্দা নদী। হ্যাঁ, যাদের খুঁজছি এদিকেই তাদের পাওয়া যেতে পারে। অতএব, দেরি না করে নদীর তীর ধরে হাঁটা দিলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে হঠাৎ একজোড়া অন্যরকম পাখির দেখা পোলাম। হ্যাঁ, পেয়ে গেছি। ফোকাস করে যেই না ক্লিক করবো, পাখি দু’টো উড়ে গিয়ে মহানন্দার অন্য তীরে গিয়ে বসল। একেবারে সীমান্তের ওপারে। কি করি? অগত্যা জুতো খুলে প্যান্ট গুটিয়ে নদীর মাঝামাঝি পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ালাম। হাঁটু পানি। কিছুটা দূর থেকে ক’টা ছবি তুললাম। এরমধ্যে একটি পাখিকে দেখলাম বালুতটে মুখ ডুবিয়ে চমৎকার ভঙ্গিতে কি যেন খাচ্ছে। সেই পাখিদের দেখা পেলাম আবার ২০১৪ সালের ৮ মে যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু তোয়াব শাকিরের অনুরোধে তার সঙ্গে তেঁতুলিয়া গেলাম মহাবিপন্ন এক পাখির সন্ধানে।
যাহোক, এতক্ষণ যে পাখিটির কথা বললাম সে হলো এদেশের এক দুর্লভ পাখি নদী টিটি (River Lapwing বা Spur-Winged Lapwing)। এক ধরনের হট্টিটি পাখি। আমাদের গ্রামের বাড়ি মেঘনার শাখা নদীর পাড়ে। এই শাখা নদীকে আমরা বলি গাঙ। ছেলেবেলায় সেখানে প্রচুর সংখ্যায় এই পাখি দেখেছি। আমাদের গ্রামে এরা গাঙ টিটি নামে পরিচিত। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Vanellus duvaucelii. এদেশের হট্টিটি প্রজাতিগুলোর মধ্যে এরা অত্যন্ত দুর্লভ। বর্তমানে এরা বিপন্নও (Endangered) বটে। মূলত চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে এদের বেশি দেখা যায়। তবে ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগেও কদাচ দেখা মেলে।
গাঙ টিটি পায়রা আকারের পাখি। লম্বায় ২৯-৩২ সেমি। ওজন ১৬৫ গ্রাম। পিঠের রঙ বেলে-বাদামি। মাথার খোঁপা, মাথা, ঘাড়, মুখমণ্ডল ঠোঁট ও বুকের উপরের অংশ কালো। বুক ধূসর-বাদামি। পেট সাদা ও পেটের মাঝখানটা কালো। লেজের শেষ প্রান্ত, পা, আঙ্গুল ও নখ কালো। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। তবে আকারে পুরুষগুলো খানিকটা বড় হয়। বাচ্চাদের মাথায় সাদা ফোঁটা এবং পিঠে হলুদ ও গাঢ় দাগ থাকে।
এরা নদী ও খাঁড়ির বালুতট এবং নুড়িসমৃদ্ধ এলাকায় বাস করে। সচরাচর একাকি, জোড়ায় বা ৪-৬টির ছোট দলে বিচরণ করে। নদীর পাড়ে হেঁটে হেঁটে ঠোঁটের সাহায্যে চমৎকার ভঙ্গিতে খাবার সংগ্রহ করে। এরা পা না ভেঙে এমনভাবে বালির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে খাবার খোঁজে যা সত্যিই হাস্যকর। কীট-পতঙ্গ, ছোট ব্যাঙ ও ব্যাঙাচি, কাঁকড়াজাতীয় প্রাণী খায়। ভোরবেলা ও সন্ধ্যার আগে এবং চাঁদনি রাতে বেশ সক্রিয় থাকে। এরা তীক্ষ্ণভাবে টিপ-টিপ বা ডিড-ডিড-ডিড স্বরে ডাকে।
মার্চ থেকে জুন এদের প্রজনন মৌসুম। নদী তীরে নুড়ি দিয়ে বাসা বানায়। বাসা মোটেও গভীর নয়। স্ত্রী গাঙ টিটি ৩-৪টি জলপাই রঙের ডিম পাড়ে। ডিম আর নুড়ি পাথর মিলেমিশে বেশ একটা ছদ্মবেশ (Camouflage) তৈরি করে। আর এভাবেই শত্রুর হাত থেকে ডিম রক্ষা পায়। বাচ্চা ফোটে ২২-২৪ দিনে। পা ও ঠোঁট ছাড়া সদ্যফোটা বাচ্চাগুলো দেখতে একদম ডিমের রঙের মতো। ফোটার ২৪-৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই বাচ্চারা মা-বাবার সঙ্গে বাসা ছেড়ে হাঁটা দেয় ও খাবারের অন্বেষণে ঘোরাঘুরি শুরু করে। এদের গায়ের রঙ এমন যে তা সহজেই পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। বাচ্চাগুলো বিপদের গন্ধ পেলে বা মা-বাবার সংকেত পেলে মুহূর্তের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বিপন্ন এই গাঙ টিটিগুলোকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তেঁতুলিয়ায় মহানন্দা নদীতে গাঙ টিটি (ছবি: লেখক)

মহানন্দা নদীর উপর দিয়ে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice