বাংগালীর আত্মপরিচয়
বছর পঁচিশেক আগেকার কথা। তখন পাকিস্তানী আমল। “জাতীয় সংহতি, কৃষ্টি” সংক্রান্ত এক প্রোগ্রামে সাংবাদিক হিসাবে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলাম। সর্বত্রই চোখ-ধাঁধানো সম্বর্ধনা। কিন্তু লাহোরের শালিমার উদ্যানের সম্বর্ধনার তুলনা হয়না। একদিকে গোধূলির রক্তিম আকাশ, আর অন্যদিকে আলো-ঝলমল শালিমার উদ্যান। রংগিন আলোর মাঝে পানির ফোয়ারাগুলো এক অপূর্ব মাদকতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। জাকজমকপূর্ণ আর অপরূপ পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত...দম্পতিরা যখন এসে হাজির হচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিলো আমরা বোধ হয় মোগলযুগে ফিরে গেছি। “বাংগালী ভাইদের” সম্মানে ছোট্ট একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল। বক্তৃতার পর সংগীত পরিবেশন করলেন, কোকিলকণ্ঠী নূরজাহান। তাঁর মধুর কণ্ঠে “আনমল ঘড়ীর গান, 'মেরা বচপন্ কা সাথী মুঝে ভুল না জানা” আজও আমার মনে রয়েছে।
আমি যে টেবিলটাতে চা খেতে বসেছিলাম, সেখানে পরিচয় হলো প্রখ্যাত উর্দু দৈনিক “নওয়ায়ে ওয়াক্ত” পত্রিকার সম্পাদক মরহুম হামিদ নিজামীর সংগে। অনেক আলাপ হলো। কথায় কথায়
বললাম, “এখনও উপমহাদেশের কোথাও যদি ধর্মকে দেখতে চাও, তাহলে বাঙ্গাল মুলুকে এসো। তবে আমাদের ওখানে রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ ধর্মকে ব্যবহার করে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি।” বিদায়ের সময় ভদ্রলোক হঠাৎ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আপ বাংগালী হোনে ছে কেয়া হুয়া, আপকো তো সাচ্চা মুসলমান মালুম হোতা হ্যায়।”
হামিদ নিজামী সাহেবের এই সার্টিফিকেটে মনঃক্ষুণ্ণ হলেও ব্যবহারে তা' প্রকাশ করলাম না। মনে মনে বললাম, এক হাজার মসজিদের শহর ঢাকায় আমার আস্তানা। আর তুমি আমাকে মুসলমানিত্বের সার্টিফিকেট দিচ্ছো?
এই ক'দিনে লাহোরের বিশেষ করে উচ্চ শ্রেণীর সমাজ জীবনের যে চেহারা দেখলাম, তাতে অন্তত তোমাদের মুখে একথা না বলাটাই শোভনীয় হতো।
এর প্রায় তেরো বছর পরেকার কথা। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোলে সপরিবারে ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে হিলির সীমান্ত অতিক্রম করে মুজিবনগরে যেয়ে হাজির হয়েছি। মাঝে মাঝে খবর সংগ্রহ আর আড্ডা দেয়ার জন্য “আকাশবাণীর” কলকাতা কেন্দ্রে সরল গুহের অফিসে যেতাম। ভদ্রলোকের আদি বাড়ি ঢাকায় এবং প্রাক পাকিস্তান যুগে ঢাকা বেতারকেন্দ্রে কিছুদিন চাকুরী করেছেন। সরলদা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কট্টর সমর্থক।
তার অফিসে বসে একদিন জোর আড্ডা হচ্ছিলো। বিখ্যাত নাট্যকার মন্মথ রায়, প্রখ্যাত বেতার কথক দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়, বাংলাদেশ-ভারত শিক্ষক সহায়ক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক দিলীপ ঘোষ, সাহিত্যিক “জরাসন্ধ” ও সাংবাদিক ডক্টর দিলীপ মালাকার ছাড়াও বেশ ক'জন গায়ক ও অধ্যাপক সেদিন আড্ডায় হাজির ছিলেন। কথায় কথায় বলছিলাম, আমরা বাংলাদেশে কেমন করে রবীন্দ্র-বিরোধীদের মোকাবিলা করেছিলাম। আরও বললাম, যে আপনারা চিন্তাও করতে পারেন না যে, মেয়েদের কপালে টিপ দেয়া নিয়েও একটা “ফাটাফাটির” অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের কড়া আদেশ মেয়েরা কপালে টিপ দিয়ে টিভির পর্দায় আসতে পারবে না। এদিকে মেয়েদের জেদ কপালে টিপ না দিয়ে ক্যামেরার সামনে যাবোনা।
সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আড্ডা ভেঙ্গে গেলো। সবার কাছে বিদায় নিয়ে বেরুতে যাচ্ছি। এমন সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক আমার হাতে হাত মিলিয়ে বললেন, “কি আশ্চর্য মশায়, আপনারা মুসলমান হলে কি হবে, আপনারা তো দেখছি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসেন?”
বাইরে কিছু প্রকাশ না করলেও, কথাগুলো আমার বুকের ভিতর কচ্ কচ্ করতে শুরু করলো। মনে মনে বললাম, বাংলা ভাষার জন্য বাহান্নো সালে ঢাকায় গুলি খেলাম আর মারাত্মক আন্দোলনের মুখে ষাট দশকে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার পর স্বাধিকারের জন্য সোচ্চার হয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আর কি আশ্চর্য, ভদ্রলোক “দাদাগিরি” দেখিয়ে এখন আমাদের বাংগালীত্বের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন?
এর প্রায় হপ্তা দুয়েক পরে এ ঘটনার উল্লেখ করে সরলদাকে বলেছিলাম, 'একটা ব্যাপারে আপনারা বোধ হয় ভুল করছেন। ওরা যেমন আমাদের “বড় ভাইয়ার” ভূমিকায় এসে ভুল করেছিলেন, আপনারা তেমনি “দাদাগিরি” দেখালে ভুল করবেন।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments