মেয়েটি যুদ্ধে গিয়েছিল
ভিতরগড়ের মোতালেব মিয়ার এক মেয়ে আসিয়া। মোতালেব মিয়া চাষি। আসিয়ার বয়স তখন পনেরো। পাঁচ ভাই-বোন ওরা। সবার বড় মন্টু মিয়া, তারপর আসিয়া। তারপর ফিরোজ, আদিনা ও রেহানা। হালের গোরু নিয়ে প্রতিদিন মাঠে যেত মোতালেব। জমিজমা আছে অল্প। দু' বিঘার মতো হবে। শীতকালে শাক-সবজি হয়। ভিতরগড় থেকে তিন মাইল দূরে সর্দার পাড়ায় ওর বাড়ি। মেয়েদের কড়া শাসন করত বাপ আর দু' ছেলের মাথা খেত আদর দিয়ে। তাদের ছিল প্রচুর স্বাধীনতা আর মেয়েদের ছিল সব রকম পরাধীনতা।
তেরো বছর থেকে আসিয়া বোরকা পরত। আদিনা ও রেহানারা বোরকা পরার বয়স তখনো হয়নি। বোরকা ছাড়া আসিয়া কোথাও বের হতে পারত না। বুড়ি দাদি, খুড়ো বা বাপের সঙ্গে ছাড়া সে কোথাও যেতে পারত না। বোরকার ভিতর থেকে সে তখন বাইরের পৃথিবী দেখত সাবধানে ও নীরবে। কথা বলার অধিকারও ছিল না। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যেত কালেভদ্রে। পাশের বাড়িটাও ছিল তিনটা ধান জমির পরে, আর সে বাড়িতে ছিল নুরু ও বশিরের মতো বড় বড় ছেলে। বাপ তাকে ও-বাড়িতে যেতেই দিত না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই ছেলে-দুটিও কোথায় যেন চলে গেল।
ঘর সংসারের কাজে আসিয়া মাকে সাহায্য করত। ঘরে সে বোরকা পরত না। ভাই-বোনদের সঙ্গে কথা বলত। ওর বড় ভাই মন্টু ওকে পাত্তাই দিত না। এমনকি ছোট ভাই ফিরোজও না। আসিয়া ছিল নেহাতই মেয়ে, লিকলিকে ও অশিক্ষিত। অ আ লিখে দু’-চারটা বানান মাত্র জানত—তাতে তাকে শিক্ষিত বলা যায় না। পড়তেও জানত ওইটুকু, লিখতেও জানত ওই পর্যন্ত। গ্রামের লোকেরা পর্যন্ত ভালো করে জানত না আসিয়া নামে একটি মেয়ে তাদের গ্রামে আছে। ভালোভাবে চেনাজানা হওয়ার পর তবেই লোক তার নাম জানত। সেই ছ' বছর বয়সে মাত্র ছ' মাস স্কুলে যেতে পেরেছিল। তারপর যে ঘরে ঢুকেছে আর বের হয়নি। ছোট বোনগুলো ওই পর্যন্তও স্কুলে যেতে পারেনি। সে বাড়ির বড় মেয়ে, ওর উপর ছিল খাবার পরিবেশনের ভার। ভাইরা খেতে বসে যে-সব কথা বলাবলি করত আসিয়া সে-সব কান ও চোখ দিয়ে গিলত। বাড়ির বাইরে যাওয়ার হুকুম তো নেই—তাই কথাগুলো মনের মধ্যে গেঁথে নিত। মুক্তিযুদ্ধের কথাগুলো সে এভাবেই শুনেছিল।
একদিন মন্টু কাউকে কিছু না বলে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে চলে গেল। আসিয়া তার মায়ের কাছ থেকে শুনতে চাইল ভাই কোথায় গেছে।
মা বলল, ‘লোকে বলে যুদ্ধ করতে গেছে।’
আসিয়া জানতে চায়, ‘পাকিস্তানিদের সঙ্গে ওরা যুদ্ধ করে পারবে?’
মা বলল, ‘লোকে বলে ছেলেরা দলে দলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে।’
আসিয়া বলল, ‘মুক্তিযুদ্ধটা কোথায় হচ্ছে?’
মা বলল, ‘ওরা সবাই ভাটপাড়া ক্যাম্পে যাচ্ছে।’
‘ভাটপাড়া কোথায়?’
‘সীমান্তের ওপারে। জহুরী বাজারের কাছে।’
'কিন্তু ওরা কি জিততে পারবে?’
মা বলল, ‘আমি জানি না।’
আসিয়া বলল, ‘থানার এক পুলিশ অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে শুনলাম। বেশ কিছু দিন ধরেই থানার অস্ত্র উধাও হয়ে যাচ্ছিল বলে ওরা তার উপর নজর রাখছিল। শোনা যায় চুরি করা অস্ত্রগুলো সে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাচার করছিল।’
এসময় বিল থেকে বাবা এসে বলল, ‘আজ ভাত পাঠালে না কেন? ফিরোজ কোথায়?’ ওই পুলিশের কী হল শেষ পর্যন্ত শোনা হলো না আসিয়ার।
রান্নাঘর থেকে ভাত আনতে আনতে সে বাবার মুখে শুনতে পেল গ্রামের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে শাহীন মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালে কাজ করতে চলে গেছে।
মা বলল, ‘মেয়েরা আবার যুদ্ধ করবে কি?’
বাবা বলল, ‘ভালো ভালো ঘরের মেয়েদের পড়তে দিলেই ওই হয়। তারা সবাই পুরুষদের কাছে পালিয়ে যাচ্ছে।’
শোনার সঙ্গে সঙ্গে আসিয়ার শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। হাতের বাটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments