পলাশীর যুদ্ধ
“সেদিন এ বঙ্গপ্রান্তে পণ্য বিপণীর এক ধারে
নিঃশব্দচরণ।
আনিল বণিকলক্ষ্মী সুরঙ্গ পথের অন্ধকারে
রাজসিংহাসন ॥
বঙ্গ তারে আপনার গঙ্গোদকে অভিষিক্ত করি নিল চুপে চুপে।
বণিকের মানদণ্ড দেখা দিল পোহালে শর্বরী
রাজদণ্ডরূপে।।”
—রবীন্দ্রনাথ
ইংরেজরা এসেছিল এদেশে বাণিজ্য করতে, ফরাসীরাও তাই। কিন্তু দৈবাৎ ফরাসী অধিনায়ক ডুপ্লের মাথায় গেল যে এই ষড়যন্ত্রপ্রিয়, অকর্মণ্য, কলহপরায়ণ অসংখ্য রাজা ও নবাবের দেশে একটু শক্তির খেলা দেখালে লাভ বই লোকসান নেই। ইউরোপীয় সৈন্যের যে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, তা সেদিন ভারতীয় সৈন্যের ছিল না, অস্ত্রশস্ত্রও খুব আধুনিক ছিল বলে মনে হয় না। সুতরাং শীঘ্রই এই দুটি দেশের বণিকরা ভারতের ইতিহাসে ভাগ্যনিয়ন্ত্রা সেজে বসলেন। কর্ণাটকের যুদ্ধে প্রথমে ফরাসী ও পরে ইংরেজ সৈন্যের শক্তির পরিচয় পাওয়া গেল। শক্তিতে হয়ত দু’দলই সমান কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন ইংরেজের, তাই ফরাসীদের ভুলে ও দুর্ভাগ্যে ধীরে ধীরে ইংরেজেরই সুবিধা হ’তে লাগল।
তবে চরম কথা বলা হয়ে গেল ১৭৫৭ সালেই—পলাশীর যুদ্ধে। সেই যুদ্ধের জয়গৌরব ইংরেজদের ললাটে যে কলঙ্কের রাজটীকা এঁকে দিলে তা প্রায় দুশো বছর স্থায়ী হয়ে রইল। না মুসলমান না মারাঠা, না দিল্লী না হায়দ্রাবাদ, না পুনা না মহীশূর—কোনও শক্তিই আর তার অপ্রতিহত বিজয়যাত্রাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না।
কলঙ্কের রাজটীকা বলছি এই জন্য যে, সত্যি-সত্যিই সেদিন ইংরেজরা যুদ্ধ ক’রে জেতে নি। হয়ত তাও জিততে পারত কিন্তু যুদ্ধ করার দরকার হয় নি, কয়েকটি বিশ্বাসঘাতক হিন্দু ও মুসলমান দেশকে স্বেচ্ছায় তুলে দিয়েছিল ইংরেজদের হাতে।
কিন্তু তার আগে সে ইতিহাসটা বলি। মুঘলদের শক্তি তখন স্তিমিত, নামেমাত্র সম্রাট আছেন দিল্লীতে।
“শবলুব্ধ গৃহ্রদের ঊর্ধ্বস্বর বীভৎস চিৎকারে
মুঘলমহিমা।
রচিল শ্মশান শয্যা, মুষ্টিমেয় ভস্মরেখাকারে
হ'ল তার সীমা।।”
সুতরাং বাংলা বিহার উড়িষ্যার সুবেদার নবাব-নাজিম আসলে স্বাধীন নৃপতি, মৌখিক একটা স্বীকৃতিমাত্র আছে মুঘল সম্রাটের অধীনতার। আসলে এটা হয়েছিল মুর্শিদকুলি খাঁর আমল থেকেই, যাঁর নামে বাংলার তখনকার রাজধানী মুর্শিদাবাদের নাম। মুর্শিদকুলির দৌহিত্র সরফরাজ খাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে তাঁর সেনাপতি আলীবর্দী খাঁ নবাব হন। আলিবর্দীর দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলা পরাজিত হন পলাশীর যুদ্ধে।
আলিবর্দীর পুত্রসন্তান ছিল না, ছিল তিনটি কন্যা। তিনটি মেয়েরই তিনি বিয়ে দেন তাঁর ভাইয়ের তিন ছেলের সঙ্গে। এক জামাই ছিলেন ঢাকার শাসনকর্তা, আর একজন পূর্ণিয়ার, ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের ছেলে সিরাজ নবাবের কাছে কাছে থাকতেন এবং তাঁকেই তিনি উত্তরাধিকারী স্থির করেন। বলা বাহুল্য যে অন্য দুই জামাই এতে খুশী হ’তে পারেন নি। আলিবর্দীর মৃত্যুর পর ঢাকা থেকে ঘসেটি বেগম সৈন্যসামন্ত নিয়ে মুর্শিদাবাদে চলে এলেন এবং যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে লাগলেন (তাঁর স্বামী তখন বেঁচে নেই), আবার এধারে পূর্ণিয়ায় সওকৎজঙ্গও (সিরাজের মাসতুতো ভাই) প্রস্তুত। তার মধ্যে ঘসেটি বেগমের দেওয়ান রাজবল্লভ ছিলেন পাকা লোক। সবাই ভেবেছিল যে বালক সিরাজ (সতেরো-আঠারো বছর মাত্র তাঁর বয়স তখন) এদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না। ইংরেজরাও তাই ভেবেছিল।
কিন্তু সিরাজ বয়সে যতই নবীন হোন জ্ঞানে কারও চেয়ে কম ছিলেন না। তিনি ইংরেজদের আসল অভিপ্রায়টা এর মধ্যেই ধরে ফেলেছিলেন। তার ওপর তিনি যখন শুনলেন যে ইংরেজরা কলকাতার দুর্গ বেশ ভাল ক’রে সারাচ্ছে এবং প্রাচীরের ওপর কামান বসিয়ে পরিখা কেটে যতদূর সম্ভব সুদৃঢ় ক’রে তুলছে, তখন আর তাঁর বুঝতে কিছু বাকী রইল না। তিনি কড়া চিঠি লিখে কৈফিয়ৎ তলব ক’রে পাঠালেন।
ইংরেজরা তখনও জানে যে রাজবল্লভ জিতবেন। ওরা তাই গোপনে রাজবল্লভের সঙ্গে ষড়যন্ত্র চালাতে লাগল। নবাবের চিঠির কোনও জবাব দিল না। তার ওপর রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণদাস সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে চরম অসদ্ব্যবহার ক’রে যখন কলকাতাতে সপরিবারে পালিয়ে গেলেন, তখন ইংরেজরা তাঁকে সাদরে আশ্রয় দিল।
সিরাজ নবাব হবার সঙ্গে-সঙ্গেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments