হিন্দু-মুসলমান বিরোধের গোড়ার কথা

II ১ II

একটা সহজ উপমা দিয়াই আরম্ভ করিব। পিতামাতা ও শিশু পুত্রকন্যা লইয়া একটি সংসার। মনকষাকষি, মান, অভিমান, নালিশ ও ঝগড়া, এমনকি অল্পস্বল্প মারামারিও যে নাই তাহা নয়। তবু পরিবার এক, কারণ উহার কেন্দ্র এক। ঝোঁকের মাথায় যে যাহাই করুক না কেন অবশেষে সকলকেই পথে ফিরিয়া আসিতে হইবে। সৌরজগতে যেমন সকল গ্রহ-উপগ্রহেরই একটা বাঁধা পথ আছে, যাহার বাহিরে যাওয়া কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়, তা সে সূর্য হইতে যতই দূরে থাকুক না কেন, আমাদের কল্পিত পরিবারেও তেমনই প্রত্যেকটি ব্যক্তিরই একটি নির্দিষ্ট স্থান ও পথ আছে; এই স্থান ও পথ ছাড়িয়া কেহই থাকিতে বা চলিতে পারে না, কারণ এই পরিবারের জীবিকার সংস্থান, ধ্যানধারণা, আশা ও আকাঙ্ক্ষা, রীতিপদ্ধতি সবই যে ব্যক্তিতে কেন্দ্রীভূত সে ব্যক্তি একক ও শ্রেষ্ঠ, সে ব্যক্তি পিতা।

ক্রমে ছেলেরা বড়ো হইতে লাগিল ও বয়স বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষার অস্তিত্ব আবিষ্কার করিতে লাগিল। তখন আর পিতামাতার সহিত সকল বিষয়ে মেলে না। দেখিতে পায়, তাঁহারা যাহা দিয়াছেন তাহার বাহিরেও বিরাট একটা জগৎ আছে, তাঁহারা যে ধ্যানধারণা বহিয়া আসিয়াছেন পৃথিবীতে তাহা ছাড়াও কাম্য জিনিস আছে; সেগুলিও উপেক্ষার বস্তু নয়। ধীরে ধীরে পিতা ও পুত্রের মধ্যে ব্যবধানের সৃষ্টি হয়, পুত্রের পরিণত জীবনের কেন্দ্র বাল্যজীবনের কেন্দ্র হইতে সরিয়া আসিতে আরম্ভ করে। এই অবস্থায়, বুদ্ধিমান হইলে পিতামাতা পঞ্চাশোর্ধ্বে বনং ব্রজেৎ নীতি অনুসরণ করেন, না হইলে পুত্রের স্বাতন্ত্র্যলাভের ইচ্ছায় বাধা দিবার চেষ্টা কবিয়া নিজের ও অপরের অশান্তি ডাকিয়া আনেন।

তার পর ভাইয়ে ভাইয়ে পৃথক হইবার পালা। যাহারা একই পিতামাতার সন্তান, আবাল্য একসঙ্গে রহিয়াছে, একসময়ে হয়তো বা একজন অপর জনকে মুহূর্তের জন্যও না দেখিতে পাইলে অস্থির হইয়া উঠিত, তাহাদের এই মর্মান্তিক ছাড়াছাড়ির কারণ হিসাবে দুইটি জিনিস প্রায় জনপ্রবাদে পরিণত হইয়া গিয়াছে। উহাদের একটি টাকা অপরটি স্ত্রী। কিন্তু এ-দুটির কোনোটিকেই ভ্রাতৃবিচ্ছেদের মূল হেতু বলা চলে না। উহারা উপলক্ষ মাত্র। স্ত্রী যাহাকে প্ররোচনা করিবে অথবা অর্থ যাহাকে প্রলুব্ধ করিবে তাহার নিজের মনে যদি ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা না থাকে, তাহা হইলে শুধু বাহিরেরই চাপে জন্মগত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হইবার নয়। তাই যে স্বাতন্ত্র্যের ইচ্ছা পিতা ও পুত্রের মধ্যে ব্যবধানের সৃষ্টি করে উহাই ভাই ও ভাইয়ের মধ্যেও বিরোধের সৃষ্টি করে বলিতে হইবে। জগতের অধিকাংশ লোক পার্থিব ব্যাপার লইয়াই মত্ত। সেজন্য এই ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সংঘর্ষ সাধারণত আর্থিক বিবাদের রূপ ধরিয়াই দেখা দেয়। কিন্তু তাই বলিয়া অর্থকেই উহার মূল মনে করিবার কোনো হেতু নাই; অর্থ অবলম্বন মাত্র; মূল মানবমনের সেই বিশিষ্ট ধর্ম যাহা আমাদিগকে যুগে যুগে কালে কালে কি পার্থিব কি অপার্থিব ব্যাপারে পরধর্ম ভয়াবহ বলিয়া স্বধর্মে নিধনকেও শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করিতে প্রণোদিত করিয়া আসিয়াছে।

ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের মূলেও আছে এই স্বাতন্ত্র্য-ভোগের ইচ্ছা। অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন এই স্বাতন্ত্র্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, দুইটি বিরাট সম্প্রদায়ের। আজ জাতীয় জীবনের যে-কোনো ক্ষেত্রই ধরি না কেন, তাহাতে সব চেয়ে বড়ো যে জিনিসটা পাই তাহা হিন্দুর হিন্দুত্ব ও মুসলমানের মুসলমানত্ব বজায় রাখিবার ইচ্ছা। হিন্দুরা অবশ্য এ-কথা স্বীকার করেন না। তাঁহারা বলেন, তাঁহারা যে আদর্শ ধরিয়াছেন উহা জাতীয় আদর্শ, মুসলমানরা বিদেশ হইতে গৃহীত আদর্শের মোহে আচ্ছন্ন রহিয়াছেন বলিয়াই ভারতবর্ষকে চিনিতে পারিতেছেন না। কিন্তু এই কথা বলিলেই বিবাদ মিটিবে না। যে রীতিনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মুসলমানরা ধরিয়া আছেন, বিদেশীই হউক কিংবা স্বদেশীই হউক তাহাকে তাঁহারা নিজস্ব বলিয়া মনে করেন। সহস্র যুক্তিতেও তাঁহারা এই আদর্শকে ছাড়িয়া অন্য আদর্শ অবলম্বন করিবেন না। পক্ষান্তরে হিন্দুরাও নিজেদের আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice