১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ লোকের মুখে মুখে সিপাহী বিদ্রোহ নামে প্রচলিত হয়ে এসেছে, এই নামটা আমরা পেয়েছিলাম ইংরেজদের কাছ থেকে। ব্র্রিটিশ সরকার এর নাম দিয়েছিলো Sepoy Mutiny অর্থাৎ সৈন্য বিদ্রোহ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তাই মনে হবে বটে তার কারণ গোরা সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহীদের স্বল্পবেতন উর্ধ্বতন নাগরিক প্রভুদের দুর্ব্যবহার এবং নানা রকম অভাব-অভিযোগ সৈন্যদের মধ্যে দীর্ঘদীন ধরে অসন্তোষ সঞ্চিত করে তুলছিল। এই সমস্ত অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল বলে ১৭৬৪ সালে দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সৈন্যদের মধ্যে এই জুলুম অবাধেই চলে আসছিল। ১৮৫৭ সালে দেশীয় সৈন্যরাই বিদ্রোহে প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই সমস্ত কারণে এই বিদ্রোহকে সৈন্যবিদ্রোহ বলে মনে করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও রাজনীতিবিদরা প্রথম দিকে এই শব্দটিকে ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু পরবর্তী অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাদের ভ্রান্ত ধারণাটিকে সংশোধন করতে হয়েছিল।
এখানে এ সম্পর্কে কয়েকজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও চিন্তাবিদদের মন্তব্য তুলে ধরছি। বিখ্যাত ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ডিজরেলি সর্বপ্রথম এই সত্যটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালের ২৭ শে জুলাই তারিখে পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্স সভায় ভাষণ দান প্রসঙ্গে তিনি সুষ্পষ্টভাবে তাঁর এই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, একে সামরিক মিউটিনি বললে ভুল বলা হবে, এ হচ্ছে জাতীয় বিদ্রোহ। এরপর আ্যয়লামবুরি সভায় প্রদত্ত এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “আমার বিশ্বাস এখন এ বিষয়ে সকলেই একমত হয়েছেন ভারতের এই দুর্ভাগ্যজনক ও অসাধারণ ঘটনাটি সম্পর্কে প্রথমে যে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, সমস্ত অবস্থা বিচার করে তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। দিনের পর দিন আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে ঘটনাটিকে প্রথম আমরা কতগুলি তুচ্ছ কারণের অথবা দুর্ঘটনার ফলে সৃষ্ট বলে মনে করেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে এটি এমন এক জাতীয় ঘটনা যার ফলে ইতিহাসে যুগ পরিবর্তন ঘটে যায়। রাজনীতিবিদগণ গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে, এর মূল কোথায় তা উপলব্ধি করতে পারবেন।”
এ প্রসঙ্গে হ্যসটিন ম্যাকারফি লিখেছিলেন, প্রকৃত ঘটানাটি হচেছ এই ভারতের উত্তর ও উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের ব্যাপক এলাকা জুড়ে দেশীয় জাতিগুলো ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। এটাকে নিছক সামরিক মিউটিনি বললে সত্যের অপলাপ করা হবে। প্রকৃতপক্ষে সৈন্যদের অসন্তোষ, ইংরেজদের প্রতি ঘৃণ্য মনোভাব এবং ধর্মান্ধতা, এই কারণগুলির সংমিশ্রণের ফলেই এই ঘটনার সৃষ্টি হয়েছিল। দেশীয় রাজ্য ও দেশীয় সৈন্যরা এই বিদ্রোহে অংশ গ্রহণ করেছিল। খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়ে মুসলমান ও হিন্দুরা তাদের নিজেদের বিরোধিতা ও বাদ-বিবাদের কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। এই বিদ্রোহ সম্পর্কে চার্লস বল অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, “অবশেষে এই বন্যা প্রবাহ দুকূল ভাসিয়ে সমগ্র ভারতবাসীর জীবন প্লাবিত করে দিয়ে গেল। তখন আশঙ্কা করা গিয়েছিল, এই মহাপ্লাবনের ফলে এ দেশ থেকে ইউরোপিয়দের নাম নিশানা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তখন এটাও মনে হয়েছিল এই বিদ্রোহের বন্যা অবসানের পর যখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে তখন দেশপ্রেমিক ভারত বিদেশী শাসকদের পরির্বতে কোনো এক দেশীয় রাজার আনুগত্য স্বীকার করবে।”
অথচ সেই সময়কার পরিস্থিতিতে এই ধরনের বিদ্রোহ সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না, এতে আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই। লর্ড ক্যানিং এদেশে বড়লাট হয়ে আসার প্রাক্কালে বিলাতে তাঁর বিদায়কালীন ভোজসভায় ভাষণদান প্রসঙ্গে উদ্বিগ্নকণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি ভারতের রাজনৈতিক গগনে একখণ্ড ঘনক্লিষ্ট মেঘ দেখা দিয়েছে, কে জানে এ কোন দুর্যোগময় পরিণতি বয়ে নিয়ে আসবে!” ভারত থেকে বহুদূরে এসেও লর্ড ক্যানিং সেদিন ভবিষ্যৎ দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন। ডালহাউসি তার কলমের এক খোঁচায় প্রথমে অযোধ্যা রাজ্য, পরে একের পর এক দেশীয় রাজ্য গ্রাস করে চলেছিলেন, তার পক্ষে এটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments