অতৃপ্ত কামনা
সাঁঝের আঁধারে পথ চলতে চলতে আমার মনে হল, এই দিনশেষে যে হতভাগার ঘরে একটি প্রিয় তরুণ মুখ তার ‘কালো চোখের করুণ কামনা’ নিয়ে সন্ধ্যাদীপটি জ্বেলে পথের পানে চেয়ে থাকে না, তার মতো অভিশপ্ত বিড়ম্বিত জীবন আর নেই!
আমারই বেদনা-রাগে রঞ্জিত হয়ে গগনের পশ্চিম দুয়ারে জ্বালা সন্ধ্যা-তারা আমার মুখে তার অশ্রু-ভরা ছল-ছল চোখ নিয়ে চেয়ে ওই কথাটিতে সায় দিলে। ঝিল্লি-তান-মুখরিত মাঠের মৌন পথ বেয়ে যেতে যেতে শ্রান্ত চিন্তা কয়ে গেল,—‘তোমায় ব্যথা বোঝে শুধু ওই এক সাঁঝের তারা!’
যদি কোনো ব্যথাতুর একটি পল্লি হতে আর একটি পল্লিতে যেতে এমনই সাঁঝে একা শূন্য মাঠের সরু রাস্তা ধরে চলতে থাকে—তার সামনে এক টুকরো টাটকা কাটা-কলজের মতো এই সন্ধ্যাতারাটি ফুটে ওঠে, তবে সেই বুঝবে কত বুক-ফাটা ব্যথা সে সময় তার মনে হয়ে তাকে নিপীড়িত করতে থাকে।
এই মলিন মাঠের শূন্য বুকে কিছু শোনা যাচ্ছে না, শুধু কোথায় সান্ধ্য নীড়ে বসে একটি ‘ধূলো-ফুরফুরি’ শিস দিয়ে দিয়ে বাউল গান গাইছে, আর তারই সূক্ষ্ম রেশ রেশমি সুতোর মতো উড়ে এসে আমার আনমনা-মনে ছোঁয়া দিচ্ছে! একটি দুটি করে আশমানের আঙিনায় তারা এসে জুটছে, আমার মনের মাঝেও তাই অনেক দিনের অনেক সুপ্ত কথার, অনেক লুপ্ত স্মৃতির একটির পর একটির উদয় হচ্ছে।…
আমার এই একই কথা, একই ব্যথা যে কত দিক দিয়ে কত রকমে মনে পড়ছে, তার আর সংখ্যা নেই। তবু বারে বারে ও-কথাটি ও-ব্যথাটি জাগবেই! মন আমার এ বেদনার নিবিড় মাধুর্যকে আর এড়িয়ে যেতে পারলে না। সাপ যেমন মানিক ছেড়ে তার সেই মানিকটুকুর আলোর বাইরে যেতে পারে না, আমারও হয়েছে তাই। আমার এই বুকের মানিক বেদনাটুকুর অহেতুক অভিমানের মায়া এড়িয়ে যেতে পারলাম না!
আমি ক্রূর হাসি হেসে মোতিকে বললাম, ‘হুঁ! কিছুতেই মানবে না তো, তবে সত্যি কথাটাই বলি,—মোতি, তোমায় যে আমি ভালোবাসি না।’ কথাটা তার চেয়ে আমার বুকেই বেশি বাজল। সে তীরবিদ্ধা হরিণীর মতো চমকে উঠে বললে,—‘কী?’...প্রিয়তমার সুখের জন্য নিজের বুকে বিষের ছুরি চালিয়ে ভালোবাসার এই যে নির্মম প্রতারণা, তার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? মোতি কি কোনোদিন বুঝতে পেরেছিল লেখকের এই অতৃপ্ত কামনার আসল ব্যাকুলতা?
অনেক দূরে হাটের ফেরতা কোনো ব্যথিতা পল্লি-বধূ মেঠো সুরে মাঠের বিজন পথে গেয়ে যাচ্ছিল,—
‘পরের জন্যে কাঁদ রে আমার মন,
হায়, পর কি কখন হয় আপন?’
আমি মনে মনে বললাম—হয় রে অভাগি, আপন হয়; তবে অনেকে সেটা বুঝতে পারে না। বুকের ধনকে ছেড়ে গেলেই লোকে ভুল বুঝে বলে,—
‘পর কি কখন হয় আপন?’
আর একজনও ঠিক এমনই ভুল করে আমায় ছেড়ে গেছে, সে বেদনা ভুলবার নয়!
পথের বিরহিণীর ওই প্রাণের গান আমায় মনে করিয়ে দিলে অমনি আর একজন অভিমানিনীর কথা। সেই দিল-মাতানো স্মৃতিটি মাঝিহারা ডিঙির মতো আমার হিয়ার যমুনায় বারে বারে ভেসে উঠছে!
তাতে-আমাতে পরিচয় তো শুধু ছেলেবেলা থেকে নয়—তারও অনেক আগে থেকে; সেই চির-পরিচয়ের দিন তারও মনে নেই, আমারও মনে নেই।...
আমাদের পাড়াতেই তার বাড়ি।
তাকে আমার বিশেষ করে দরকার হত সেই সময়, যখন কাউকে, মারবার জন্যে আমার হাত দুটো ভয়ানক নিশ-পিশ করে উঠত। এ-মারারও আবার বিশেষত্ব ছিল; যখন মারবার কারণ থাকত, তখন তাকে মারতাম না, কিন্তু বিনা কারণে মারাটাই ছিল আমার খেপা-খেয়াল। আমার এ-পিটুনি খাওয়াটাকে সে পছন্দ করত কি না জানি নে, তবে দু-দিন না মারলে সে আমার কাছে এসে হেসে বলত,—‘কই ভাই, এ দু-দিন যে আমায় মারনি?’
আমি কষ্ট পেয়ে বলতাম,—‘না রে মোতি, তোকে আর মারব না!’ তার পর, সে সময় আমার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments