আওরঙ্গজেব
সেই কতোদিন আগের কথা ৷
তখন রাজা ছিল, বাদশা ছিল। ছিল উযির-নাযির, সিপাই-সান্ত্ৰী আরো কতো কি!
সেই সব রাজা-বাদশার আবার নানান রকম খেয়াল থাকতো। তাদের আনন্দ দানের জন্য থাকতো নানান ধরনের খেলার আয়োজন। এমনি ধরনের খেলা ছিল হাতীর লড়াই।
হাতীর লড়াই?
হ্যাঁ হাতীর লড়াই। দুই প্রকাণ্ড হাতীকে লাগিয়ে দেওয়া হতো লড়াইয়ে। একটা আরেকটাকে দেখে রেগে যেতো, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়তো অন্যটির উপর।
প্রায় সাড়ে তিন শ বছর আগে এমনি এক হাতীর লড়াই হয়েছিল যমুনা নদীর তীরে আগ্রার দুর্গের প্রাঙ্গণে।
রাজা এসে বসেছেন প্রাসাদের অলিন্দে। হাতীর লড়াই দেখবেন তিনি সেই খোলা বারান্দায় বসে। সঙ্গে তাঁর জনাকয় পারিষদ।
রাজার চার ছেলে কিন্তু লড়াই দেখবে প্রাঙ্গণের ভিতরে ঘোড়ায় চড়ে। মানে যেখানে লড়াই হবে, তার ধারে কাছে তারা থাকবে।
লড়াই শুরু হয়ে গেল সুধাকর আর সুরতসুন্দরের মধ্যে।
বুঝতেই পারছো ওগুলো হাতীর নাম। তখন তো রাজা-বাদশাদের পোষা সমস্ত জীব-জানোয়ারের খুব বাহারের নাম থাকতোই!
সুধাকর ছিল দাঁতাল। যে হাতীর দাঁত থাকে তাকে বলে দাঁতাল হাতী। আর সুরতসুন্দর ছিল দাঁতবিহীন। কিন্তু হলে কি হবে, যুদ্ধের সময় কার দাঁত আছে কার নেই ওসব মনে থাকে নাকি! লেগে গেল এদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ।
খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন সম্রাট।
লড়াইর মাঠে চার রাজপুত্র, ঘোড়ায় সওয়ার।
অনেকক্ষণ ধরে চলল সেই যুদ্ধ দুই হাতীর মধ্যে।
তারপর দাঁতাল হাতী সুধাকরের আক্রমণের সামনে আর টিকতে পারল না সুরতসুন্দর। সুরতসুন্দর রণে ভঙ্গ দিল। উল্টোদিকে ফিরে সে সোজা ভোঁ দৌড়! দৌড়ে সে পালিয়ে গেল। কিন্তু দৌড়ে পালিয়ে গেলেই তো হলো না!
সুধাকরের যুদ্ধের শখ যে তখনো মিটেনি। শরীরটা তার মাত্র গরম হয়েছে। সমস্ত শরীরে রাগ নিশপিশ করছে। দুশমন তার পালিয়ে গেছে। এখন সে তার রাগ মিটায় কি করে? সুধাকর তখন কি করল জানো?
দারুণ রঙচঙে পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়ে মজা দেখছিলো চার রাজপুত্র; সেই দৃশ্য তার সহ্য হলো না। কাজেই ওদিকেই সে তেড়ে গেল তার ভয়ঙ্কর দাঁত উঁচিয়ে রাজ্যের ভবিষ্যত রাজা হলো রাজপুত্র। পাগলা হাতী তাঁদের আক্রমণ করে বসল! সর্বনাশ! খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিলেন শাহানশাহ্, তাঁর তো চক্ষুস্থির!
ভয়ে অস্থির হয়ে গেল সমস্ত পারিষদ। সিপাই-সান্ত্রী, উযির-কোতয়াল। অথচ এমন আচম্বিতে ঘটনাটি ঘটে যাচ্ছে, কারো কিছু করার নেই। কি হয় না হয়, রুদ্ধশ্বাসে তারা দেখতে লাগল।
তারপর কি হলো?
ভয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেলো রাজপুত্রেরা। যে যেদিকে পারে। প্ৰাণ নিয়ে প্রাণের ভয়ে,
তিন রাজপুত্র পালালো তিনদিকে।
আর বাকি একজন? বাকি একজনের কি হলো? রাজপুত্র চারজন ছিলো না?
বাকি একজনের ঘোড়াও পিছন দিকে ফিরে দৌড়ে পালানোর জন্য ভীষণ তড়বড় করছিল। তীক্ষ্ণ হ্রেষা রবে সবাইকে সে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু রাজপুত্র শক্ত হাতে ধরে রইলো লাগাম। এক হাতে লাগাম ধরে রাখলো প্রাণপণে। অন্য হাতে উদ্যত বর্শা। সুধাকর দেখল তার সামনে একজন মাত্র আছে। তাকেই সে আক্রমণ করবে। তাকে মেরে কুপোকাত করে নিজের রাগ ঠাণ্ডা করবে সে।
তেড়ে আক্রমণ করতে গেল সে রাজপুত্রকে!
নির্ভীক রাজপুত্র প্রচণ্ড বেগে নিক্ষেপ করলো বর্শা নির্ভুলভাবে লক্ষ্য স্থির করে। বর্শা গিয়ে বিদ্ধ হলো সুধাকরের কপালে।
ক্ষেপে গেল সুধাকর ৷
সে পাল্টা আক্রমণ করল রাজপুত্রকে।
রাজপুত্রের ঘোড়া দাঁতাল হাতীর আক্রমণে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে গেল। ছিটকে পড়লো রাজপুত্র।
ছিটকে পড়লো, কিন্তু সাহস হারালো না, এতটুকু ভয় পেলো না। চোখের পলকে হাতে তুলে নিলো নিক্ষিপ্ত বর্শাটি। সেটি মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। রাজপুত্র বর্শা তাক করলো উদ্যত সুধাকরের দিকে। সুধাকর এগিয়ে আসছে।
স্তম্ভিত বিস্ময়ে আর রুদ্ধশ্বাস ভয়ে দেখছেন বাদশাহ্, পারিষদ, সিপাই-সান্ত্রী।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments