কেন বই পড়ি
লেখক:
শিরোনামে প্রশ্নবোধক চিহ্নটিকে বাদ দিয়েও যে প্রশ্নের আমি উত্থাপন করেছি, তার একটা সংক্ষিপ্ত জবাব হতে পারে এই যে, বই আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রসারিত করে, আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ায়। কিন্তু শুধুমাত্র এইটুকু সংক্ষিপ্ত জবাবই সব নয়। প্রশ্ন উঠবে, সব বই তো আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ায় না, তাহলে? কথাটা সত্যি। আর বস্তুজগৎ সম্বন্ধে মানুষের বিধিবদ্ধ ধারণাকে যদি জ্ঞান বলে ধরে নিই আমরা, তাহলে ‘পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে'র তুলনায় জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' যে কিছুই নয়, একথাও সত্যি। কিন্তু সবটা সত্যি নয়! কেননা, শুষ্ক বিদ্যাচর্চার—কতগুলো তথ্য আর পরিসংখ্যানকে মুখস্ত করার—কোনোই মূল্য নেই যদি না তার সঙ্গে মানুষের নাড়ির কোনো যোগ থাকে। আর এটা তো এখন স্বীকৃত সত্য যে, আধুনিক বিজ্ঞান ভয়ঙ্কররকমভাবে ব্যক্তিনিরপেক্ষ হয়ে উঠেছে, যাতে মন বা প্রত্যক্ষ অনুভূতির কোনো স্থান থাকছে না।
তুলনায় একজন কবি গূঢ় তত্ত্বকথা কত সহজেই না আমাদের হৃদয়ে, আমাদের অনুভূতির রাজ্যে পৌঁছে দিতে পারেন। কবি যখন বলেন, ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,/চুনি উঠল রাঙা হয়ে,/আমি চোখ মেললুম আকাশে—/জ্বলে উঠল আলো/পুবে পশ্চিমে।' তখন তা হয়ে ওঠে আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের কোনো গভীর তত্ত্বের নির্যাস। কিংবা কবি যখন বলেন, ‘চারিদিকে অন্ধ ভিড় অলীক প্রয়াণ/মন্বন্তর শেষ হলে পুনরায় নব মন্বন্তর;/যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল; ইত্যাদি, তখন তা মানব-ইতিহাসেরই সারাৎসার হয়ে ওঠে, যদি আমরা এই কথা মনে রাখি যে, পৃথিবীর কোনো জাতিই একটানা কুড়ি বছর নিরবচ্ছিন্ন শান্তিতে কাটিয়েছে, ইতিহাসে এটা বিরল ঘটনা।
বস্তুত কাব্যচর্চা বা সাহিত্যচর্চা হলো জীবনচর্চারই একটা অঙ্গ। কোনো সভ্যজাতি কখনও এর থেকে মুখ ফেরায়নি। কিন্তু আমরা খুব সামান্যতেই সন্তুষ্ট। দুটো ডাল ভাত আর মাথা গোঁজার একটা গর্ত—এই পেলেই আমরা সুখী! ইদানীং দূরদর্শনের কল্যাণে আমাদের গর্তপিয়াসী জীবন সুখের একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। গ্রন্থপাঠে আমাদের মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে, বই আমাদের কল্পনাকে উজ্জীবিত করে। এমনকি কোনো উপন্যাস পাঠকালে সেই উপন্যাসের লেখকেরও একটা ছবি মনে মনে গড়ে তুলি আমরা। এইভাবে কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে। কিন্তু দূরদর্শনের চিত্রমালা আমাদের মস্তিষ্ককে ঘুম পাড়িয়ে দেয় আর চোখের স্নায়ুগুলোকে অত্যধিক পরিশ্রমে ‘ক্লান্ত’ করে তোলে। প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বই পড়া' নামক প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘যে সমাজে কাব্যচর্চা হচ্ছে বিলাসের একটি অঙ্গ, সে সমাজ যে সভ্য, এই হচ্ছে আমার প্রথম বক্তব্য। যা মনের বস্তু তা উপভোগ করার ক্ষমতা বর্বরজাতির মধ্যে নেই, ভোগ অর্থে তারা বোঝে কেবলমাত্র দৈহিক প্রবৃত্তির চরিতার্থতা। ক্ষুৎ পিপাসার নিবৃত্তি পশুরাও করে, এবং তাছাড়া আর কিছু করে না। অপরপক্ষে যে সমাজের আয়েসির দলও কাব্যকলার আদর করে, সে সমাজ সভ্যতার অনেক সিঁড়ি ভেঙেছে।'
ফ্রান্সিস বেকন তিনটি আবিষ্কারকে মানুষের সবচেয়ে ক্রান্তিকারী আবিষ্কার বলে মনে করতেন—বারুদ, কম্পাস ও মুদ্রণযন্ত্র। তাঁর মত মেনে নিয়েও বলব, এই আবিষ্কারগুলির আগে আরো একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল আর তা হলো, কথ্য ও লিখিত ভাষার বিবর্তন। জন্তু-জানোয়ারদের মধ্যেও কোনোরকম ভাষার প্রচলন থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের ভাষার সঙ্গে সেই ভাষার তফাৎ এতটাই বেশি যে, দুয়ের মধ্যে কোনো তুলনাই চলে না। একেবারে গোড়ার দিকে মানুষের ভাষাও ছিল কতগুলো অর্থহীন ধ্বনিনির্ভর। মানুষের চোয়াল ছিল তখন এখনকার চেয়ে অনেক বড়। ক্রমাগত হাতের ব্যবহারের ফলে সেই চোয়াল ছোট হয়ে গেল, ধীরে ধীরে ভাষারও জন্ম হলো। সেই সময় মানুষ তার চিন্তা-ভাবনাকে পুঁথিতে লিপিবদ্ধ করবার কোনো পদ্ধতি জানত না। কিন্তু তবু পাথরের গায়ে দাগ কেটে সে তার মনের ভাবকে ধরে রাখার চেষ্টা করত। তারপর এল হাতে লেখা পুঁথি, এল ছাপাখানা। মানুষের জীবনে ছাপাখানা এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে এল। একজন মানুষের বিশেষ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments