শ্রমিক নেতা কমরেড আনোয়ার হোসেন
১৯৯৩ সালে সিপিবি এক বড় রাজনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে, অনেক পার্টি কমরেড দল ত্যাগ করে চলে যান, অনেকে একদম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, পার্টিকে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নামতে হয়েছিল, সারাদেশের মতো ময়মনসিংহ-নেত্রকোনাতেও পার্টি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, নেতৃত্বের বড় অংশ বিভ্রান্ত হয়ে দলত্যাগ করে বিভিন্ন দলে চলে যান, তাদের কেউ একথাও বলতেন, কমিউনিস্ট পার্টির আর কোনো প্রয়োজন নেই, এই পার্টি বাংলাদেশে থাকবে না। পার্টিকে বিলোপ করার গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে দীর্ঘদিন যাবত পার্টিকে নিষ্ক্রিয় রেখে, কমরেডদের বিভ্রান্ত করে পার্টির অস্তিত্ব বিলোপ করতে চেয়েছে। এ কাজে পার্টির বিভিন্ন জেলার মূল নেতৃত্ব জড়িয়ে যান, তারা ছিলেন প্রভাবক শক্তি, ইন্টেকলেচুয়ালি নানা ডাইমেনশনে পার্টির সাধারণ কমরেডদের সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু সাধারণ কমরেডরা এ ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল বক্তব্যে মোটেও বিভ্রান্ত হননি, এই কমরেডরা পার্টিকে রক্ষার কাজে বরং অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। আনোয়ার হোসেন এই অনন্য ভূমিকার অসাধারণ কমরেড ছিলেন। বলা চলে দুঃসময়ে পার্টি রক্ষার সংগ্রামে সহযোদ্ধা।
খুব সাধারণ পরিবারের মানুষ তিনি, যে কারণে শ্রেণি অবস্থান নিয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিকে বুঝতে পারতেন, আদর্শকে ধারণ করতে পারতেন। এবং স্বাভাবিকভাবে তিনি গণসংগঠন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টিইউসিকে।
টিইউসি করার লোকজন কম ছিল, এই সংগঠন করার কাজ উৎসাহ নিয়ে করতে চাইতেন না কমরেডদের একাংশ, বিরক্তিকর কাজÑপ্রতিদিনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়, মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে সংগঠন গড়ে তুলতে হয়, এই কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আনোয়ার ভাই। অভাবের সংসার, নানা টানাপোড়েনে থাকতেন, কিন্তু কখনও বিরক্ত বোধ করতেন না, পার্টি করতে এসে, বরং আনন্দ নিয়ে নিরবে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
পার্টির সংকট সময়ে নেত্রকোনা যাওয়া একটা রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে ছিল, সাংগঠনিক দায়িত্ব নিয়ে এখন যেমন নানা ধরনের নিয়ম চালু তখন এই নিয়মগুলো ছিল না, মনে হতো একজন পার্টি সদস্য হিসেবে যখন যেখানে যতটুকু দায়িত্ব পালন করা যায়, ততটাই পার্টির জন্য লাভ। সেই ইচ্ছা থেকে নেত্রকোনা, শেরপুর কাছাকাছি হওয়ায় যাওয়া হতো বেশি। শেরপুর তো সাংগঠনিকভাবে দীর্ঘ সময় ময়মনসিংহের সঙ্গে যুক্ত ছিল, একে জেলার মর্যাদায় নেওয়ার তাগিদ অনুভব করতাম। কিন্তু নেত্রকোনা জেলায় এমন সাংগঠনিক অবস্থায়ও পার্টি সদস্য বেশি ছিল। এই রকম সাংগঠনিক যাতায়াতের এক পর্যায়ে আনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। সহজ-সরল পার্টি অন্তঃপ্রাণ একজন মানুষ। ময়মনসিংহে দোকান কর্মচারী ইউনিয়নের সম্মেলনে তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই, এখানে সম্মেলনে আনোয়ার ভাই শুভেচ্ছা জানান তারিখ খেয়াল নেই, তাঁকে আমার বাসায় নিয়ে আসি, আমার বাসায় দীর্ঘক্ষণ রাজনীতি, সাংগঠনিক, পারিবারিক বিষয় নিয়ে আলাপ হয়। সেই থেকে একটা ঘনিষ্ঠতাও গড়ে ওঠে। একবার তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম, বড় মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল, কয়েকদিন আগে এই মেয়ের বরসহ দেখা হয়েছে।
কমরেড আনোয়ার হোসেনের আদি বাড়ি কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি অঞ্চলে ছিল, আনোয়ার ভাইয়ের জন্ম নেত্রকোনায়, ওনার পিতা নূর হোসেন ব্যবসা করতেন। তাঁর কিশোর জীবন কেমন ছিল আমার জানা নেই কিন্তু রাজনীতির জীবন নিয়ে যা জেনেছি, তা হলো কমিউনিস্ট আদর্শকে তিনি মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। আমরা অনেকে রাজনীতি করি ঠিক কিন্তু পরিবারকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে রাখি, এমন ছিলেন না তিনি, চেষ্টা করেছেন পরিবারের সদস্যরা এই আদর্শ লালন করুক।
সহজ-সরল মানুষ ছিলেন, পার্টির খুঁটিনাটি কাজ করেছেন, ব্যানার টানানো থেকে, পার্টির অফিস গুছিয়ে রাখা, পোস্টার সাঁটানো, মাইক নিয়ে দৌড়ানোÑএসব কাজ কমিউনিস্ট পার্টির অনেক কমরেড করে থাকেন, যারা একবার এ ধরনের কাজের দায়িত্ব নেন তাদের এই দায়িত্ব চলতে থাকে, আনোয়ার ভাইয়ের বেলায়ও একথা বলা চলে। মানুষ মাত্রই রাগ থাকে অভিমানÑথাকে আনোয়ার ভাই তার ব্যতিক্রম নন কিন্তু রাগ-অভিমান পুষে রাখতেন না।
সবাইকে নিয়ে পথ চলাতে স্বচ্ছন্দ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments